ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

আমাদের পররাষ্ট্রনীতি খেই হারাচ্ছে

আমাদের পররাষ্ট্রনীতি খেই হারাচ্ছে
×

মোজাম্মেল হোসেন

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪০

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের কিছু উজ্জ্বল স্মৃতিকণিকা বাংলাদেশের জনগণের জন্য রয়ে যাবে। একটি হচ্ছে এবার সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

১৯৩ সদস্যের সংস্থায় চার দশকের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার সভাপতিত্ব পাওয়া সন্তোষজনক বৈ কি। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই পরিবারভুক্ত তৃতীয় সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিলেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান। চমকপ্রদ এ ঘটনা নজিরবিহীন; যদিও তা আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পারিবারিক প্রাধান্য নির্দেশ করে। অবশ্য ঘটনা দুটিই আপতিক। বিশ্ব পরিসরে আমাদের বিশেষ কোনো অবদান বা ভূমিকার কারণে এগুলো ঘটেনি। তেমন কোনো ভূমিকা আদৌ আমরা পালন করতে যাচ্ছি কিনা, সেটাও একটি প্রশ্ন হতে পারে। 

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর নানা বিষয়ে সংস্কার নিয়ে অনেক উঠ-বস অনুশীলন হলো। প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক কমিশন গঠন করলেও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে তা হয়নি। তবে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালে বলবৎ দেশের সংবিধানের কতক মূল আদর্শিক ও নীতিগত বিষয় থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তেমনি পররাষ্ট্রনীতিতেও মোড় পরিবর্তন ঘটছে। 

আমাদের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে লিখিত আছে– ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়।’

মূল নীতিমালা অনুসরণ করে আমরা সার্বভৌমত্ব ও সমতা, যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ অনুসরণ এবং সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদ-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছি। এতে প্রতিবেশীসহ বিশ্বের সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। ৫ আগস্টের পর এ ভারসাম্যে কিছু ব্যত্যয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দুবছর ধরেই সম্পর্ক খুব শীতল এবং প্রায় অস্বাভাবিক। জাতিসংঘ অধিবেশনে যাওয়ার প্রাক্কালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘রিসেট’ তথা নতুনভাবে শুরু করার লক্ষ্য ব্যক্ত করেন সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে। অন্যদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে দৃশ্যত সম্পর্কোন্নয়নের পাশাপাশি জোটনিরপেক্ষতা থেকে সরে এসে সদ্য গঠিত ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলে কথিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার অতি আগ্রহ প্রকাশ; সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহু সমালোচিত একপেশে বাণিজ্য চুক্তি করাসহ সার্বিক ভারসাম্য ওই বৃহৎ শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া লক্ষ্য করছেন পর্যবেক্ষকরা। 

এই পটভূমিতে সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ এবং নিউইয়র্কে তাঁর চার দিনের সফরকালে কোন কোন শীর্ষ নেতার সঙ্গে সাইডলাইন বা পার্শ্ব বৈঠকগুলো হলো; বৈশ্বিক রাজনীতির কোন স্রোতধারার প্রতি আগ্রহ ব্যক্ত হলো; সেসবের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে।  

২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে জাতিসংঘে দেওয়া তাঁর ভাষণে তারেক রহমান নতুন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর সরকারের পদক্ষেপ ও পরিকল্পনাগুলো উল্লেখ করেন। এসবের কোনোটাই দেশবাসীর অজানা নয়। পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সাহায্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। 

তবে বাস্তব কূটনৈতিক তৎপরতায় কী ঘটল? প্রধানমন্ত্রীর পার্শ্ব বৈঠকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈঠকটি হয় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে। সংক্ষিপ্ত হলেও বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত ওই অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান ও শান্তি, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি জাহাজ, প্রবাসীদের নিরাপত্তা, বাণিজ্য প্রভৃতি টাটকা ইস্যুর স্বার্থে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এ দুটি দেশের সঙ্গে গত দুই বছরে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার প্রক্রিয়া আছে। এ ছাড়া সাক্ষাৎ ও বৈঠক হয়েছে মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স; ক্রোয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভুটান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সৌদি আরব ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ মানবাধিকার, শরণার্থী, মিয়ানমার প্রভৃতি-সংক্রান্ত শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিশেষ দূত, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট প্রমুখের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা শরণার্থী ও সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক জরুরি বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি অংশ নেন। বিশেষ কৌতূহলোদ্দীপক এক ঘটনায় বোয়িং কোম্পানি থেকে বাংলাদেশের ১১টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তাতে অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বহু সংখ্যক শীর্ষ নেতার সমাগম হয় বলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন বড় আকারের কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া ও অর্থনৈতিক কূটনীতি চর্চার একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

মাত্র চার দিনের এ সফরে তারেক রহমানের অতি ব্যস্ত সময় কাটানো; ১১ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক; ৩০টি প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ; কয়েকটিতে ভাষণ দেওয়া এবং তাঁর সফরসঙ্গী কর্মকর্তাদের মিলিতভাবে ৮০টি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নতুন সরকারের জন্য একটি অভিজ্ঞতা বটে। তবে যোগযোগগুলো সংখ্যায় বেশি হলেও গুরুত্ব ও মাত্রায় উঁচু পর্যায়ের না। এ অধিবেশনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসেননি। স্মরণ করা যায়, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর মাত্র ৯ দিন আগে দিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন হয়, সেখানে এই তিনজনসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ নেতারা ছিলেন। তারেক রহমান সেখানে আমন্ত্রণ পেয়েও দুর্বোধ্য কারণে যাননি। বলা যায়, গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সংকুচিত করে ফেলেছে। কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুগত্য অনেকটা দৃশ্যমান; বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তিসহ। 

২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাইডলাইনে নতুন একটি জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এর নাম ‘পার্টনার্স ফর মাল্টিল্যাটারালিজম ইনিশিয়েটিভ’ (পি-ফোর-এম) বা বহুপাক্ষিকতার অংশীদারগণ। এ অনুষ্ঠানে অনেক দেশ অংশ নিয়েছে; বাংলাদেশ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে এ মঞ্চের উদ্যোক্তা দেশগুলো হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (২৭টি দেশ), ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, কেনিয়া ও বার্বাডোজ। এই মুক্ত সংগঠনে আরও কয়েকটি দেশ স্বাক্ষর করে যুক্ত হয়েছে। ব্রিকসে আবার চীন, রাশিয়া, ভারত প্রভৃতি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ আছে, যারা চ্যালেঞ্জ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও জি৭ জোটকে। বিশ্বের পুরোনা কাঠামো সংস্কারের এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক উদ্যোগগুলো চিত্তাকর্ষক ও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশ বরাবরই বহুপক্ষীয় উদ্যোগে থেকেছে। শেখ হাসিনার সরকারের সময় ব্রিকসের সদস্য হতে আবেদন করলেও বাংলাদেশ এখনও তা হয়নি। তবে ব্রিকসের ব্যাংকে আগেই যোগ দিয়েছিল। তারেক রহমান ব্রিকস এড়িয়ে গেলেন। পি-ফোর-এমে বাংলাদেশ আগ্রহী হবে কিনা, বলা যায় না।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় ফিরে এসেছেন। যাওয়ার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির যে পদক্ষেপটি তুমুল আলোচিত হয়েছে সেই প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে অস্বস্তিকর সম্পর্ক এবং কবে তিনি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ছয় মাস আগে দেওয়া আমন্ত্রণ রক্ষা করে সে দেশে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন। সেই জট তাঁকে খুলতে হবে। দেখা যাক, তিনি কী করেন।

মোজাম্মেল হোসেন: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×