বাজার পরিস্থিতি
তদারকি বাড়ান
আইভি রহমান
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০
দেড় বছরেরও বেশি সময় করোনা অতিমারির কারণে জাতীয় অর্থনীতিসহ নানা দিকেই এর অভিঘাত লেগেছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন। অনেকেরই আয়-রোজগার কমে গেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নানা মাত্রায় সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক আর্থিক চাপ। এর মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় নাভিশ্বাস উঠেছে। হঠাৎ পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়ে গেছে ১৫-২০ টাকা। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর নানা অজুহাতে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর ফন্দি আঁটেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এ ব্যাপারে খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের।
আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কম, তাই দাম বেশি। চাল আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্য। দফায় দফায় বাড়ছে চালের দামও। তা ছাড়া ভোজ্যতেল, আটা, চিনিসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সবজির দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। বাজারে পর্যাপ্ত সবজির সরবরাহ থাকলেও কোনোটিরই দাম কম নয়। দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন ক্ষেত্র, পাইকারি বাজার আর খুচরা বাজারের এই তিন স্তরের মধ্যে দামের পার্থক্য অনেক। উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, মধ্যস্বত্বভোগীরা সব ফায়দা লুটে নেয়- এ অভিযোগ নতুন নয়। সবকিছু মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চাহিদার চেয়ে পরিমাণে বেশি পেঁয়াজ দেশে থাকার কথা। আমরা জানি, পেঁয়াজ নিয়ে অতীতে ব্যাপক তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে। 'সিন্ডিকেট' কারসাজি করে বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল বিপুল পরিমাণ টাকা। অথচ এর কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার হয়নি! আমাদের ঘাটতি পেঁয়াজ আমদানির বড় উৎস ভারত। সম্প্রতি ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় এবং কয়েক দিন ভারত থেকে দেশে পেঁয়াজ না আসায় এরও বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাজারে।
আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই লিখেছিলাম, বিকল্প উৎস হিসেবে তুরস্ক, মিয়ানমার, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার যৌক্তিক কারণ কী? বাজারে ধ্রুপদি নিয়ম ছাড়াও করোনাকালে সবাই যখন সাধ্যমতো বিপন্ন-বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তখনও আমরা দেখেছি অসাধু আমদানিকারকরা অতি মুনাফার চিন্তাই করেছে। করোনার কারণে মানুষের সামাজিক-আর্থিক অবস্থা যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, এর মধ্যে বাজারে অস্থিতিশীলতা 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের এমন চিত্র দেখে আমরা বিক্ষুব্ধ হলেও বিস্মিত নই। কারণ, সুযোগ বুঝে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই যে ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের পকেট স্ম্ফীত করে; এই হীন চেষ্টা নতুন কিছু নয়। আমরা মনে করি, বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে আমদানি পণ্যের পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত পণ্যের সরবরাহ লাইন নির্বিঘ্ন রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বাজারে কঠোরভাবে তদারকি নিশ্চিত করাও সমভাবে জরুরি। অতি মুনাফার হীন চেষ্টা চালিয়ে কীভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যায়, তা আমাদের বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ না করে পারে না। সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে আর্থসামাজিক সংকট মোকাবিলা করার পরিকল্পিত ও কার্যকর উদ্যোগের ওপর আমরা জোর দিই। নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতেই হবে। টিসিবির ট্রাকসেলের পরিসর বিস্মৃত করাও সমভাবে জরুরি। পেঁয়াজ নিয়ে নতুন করে বাজারে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে, এর নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমরা জানি, পেঁয়াজে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কঠিন কোনো বিষয় নয়। কারও ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজে যেন অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হয়, সেদিকে নজর দেওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। সরকারকে যেমন ভোক্তার স্বার্থ দেখতে হবে, একই সঙ্গে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দিকও দেখতে হবে। তবে কোনোভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীদের ছাড় দেওয়া যাবে না। বাজারে তদারকি-নজরদারি বাড়াতে হবে, যেন অন্যায্যভাবে কোনো ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোক্তার পকেট কাটতে না পারে। এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলকে নির্মোহ ও কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। আমরা দেখতে চাইব, বাজার স্থিতিশীল রাখতে কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
- বিষয় :
- বাজার পরিস্থিতি
- সম্পাদকীয়