ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজশাহী

স্টেশন ভাঙচুর, মামলা হয়নি, তবু হুংকার

চার সদস্যের তদন্ত কমিটি

স্টেশন ভাঙচুর, মামলা হয়নি, তবু হুংকার
×

এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে গত রোববার মধ্যরাতে সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে রাজশাহী রেলস্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল শিক্ষার্থী সমকাল

 রাজশাহী ব্যুরো ও রাবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী রেলস্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারের উপস্থিতিতে রোববার রাত ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত স্টেশনে ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়নি। বিষয়টি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। 

শিক্ষার্থীরা জানান, ঘটনার সূত্রপাত রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আসিফ ও মাহিন আহমেদ বিনা টিকিটে ভ্রমণ করায় রাজশাহী স্টেশনে দায়িত্বরত রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীও তাদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এ সময় রেলের নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা শিক্ষার্থীদের মারধর করেন। আইয়ুব আলী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। 

শিক্ষার্থীদের মারধরের পর জড়িতদের এক ঘণ্টার মধ্যে আটকের দাবি জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দীন আম্মার। তা না হলে প্রতিটি ট্রেন থেকে দুজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নামিয়ে রাখার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তবে নির্দিষ্ট সময়ে তাদের আটক না করায় রাত ১১টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে রেললাইন অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ১১টায় আম্মারের উপস্থিতিতে রাজশাহী রেলস্টেশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেওয়া হয়। এতে রেল কর্তৃপক্ষ ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা বাতিল করে। প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী রেলস্টেশনে প্রবেশ করেন। তারা স্টেশনের মূল ভবনের টিকিট কাউন্টার, ডাস্টবিন, জানালার কাচ, পার্সেল অফিস ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয় ভাঙচুর করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি প্রচেষ্টা চালানোয় রাত দেড়টার দিকে স্টেশন ত্যাগ করেন শিক্ষার্থীরা। ফেরার সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় দুই রাউন্ড গুলির শব্দ পাওয়া যায়। 

ভাঙচুর চলাকালে ঘটনাস্থলে যান মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনসহ দলীয় নেতারা। রিটন ভাঙচুর বন্ধ করে শান্ত হবার অনুরোধ করলে শিক্ষার্থীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন। পরে মহানগর ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সেখানে গেলে তারাও তোপের মুখে পড়েন। এ সময় বিএনপি নেতারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

সোমবার সকাল ১০টায় রাজশাহী রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের দরজা, টিকিট কাউন্টার, রেস্টহাউসের জানালা, আবাসিক হোটেলসহ সব স্থাপনার কাচ ভাঙা। সব সিসি ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। কয়েকজন কর্মী ভাঙা কাচগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন। তারা জানান, রাতে ভয়ংকর তাণ্ডব চালিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দফায় দফায় ভাঙচুর করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা এলেও নির্বিকার ছিলেন। এ ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

আম্মার বললেন, হাজারটা মামলা হলেও দেখার নাই
ভাঙচুর প্রসঙ্গে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমি বিন্দুপরিমাণ অ্যাপলজি করব না। কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলার পরিনাম ভয়ানক, সেটা আজ বুঝেছে হয়তো। রেলস্টেশনে ভাঙচুর ফৌজদারি অপরাধ কিনা– জানতে চাইলে আম্মার বলেন, ‘রাষ্ট্রের একটা থাইগ্লাসের প্রতি তাদের যে মায়া, এর এক হাজার ভাগের একভাগ শিক্ষার্থীদের প্রতি থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। এটা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এজন্য যদি হাজারটা মামলা হয়, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়।’ 

এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) আব্দুল আলিম বলেন, টিকিট না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা বা ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই শিক্ষার্থীকে মারধর করা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি। আশা করি, তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। 

তদন্ত কমিটি গঠন
শিক্ষার্থীকে মারধর ও রেলস্টেশনে ভাঙচুরের ঘটনাসহ সার্বিক বিষয় তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোসাম্মাৎ হাসিনা খাতুনকে। সদস্য হিসেবে আছেন বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. শাকিল আহমেদ, আরএনবি কমান্ড্যান্ট রেজওয়ানুর রহমান এবং বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী আহমেদ ইশতিয়াজ জহুর তানিম। এ ছাড়াও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে বিভাগীয় কমিশনারকে আরও একটি কমিটি গঠনের অনুরোধ জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, আমরা সার্বিক বিষয় তদন্ত করতে ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছি। এর পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনারকেও আলাদা একটি কমিটি করতে অনুরোধ জানিয়েছি। তার সঙ্গে করণীয় বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছি। এ ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

দুই মাসে তিনবার রাবি শিক্ষার্থীদের হেনস্তা 
গত দুই মাসে এ নিয়ে তিনবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, মারধর ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার রাতে খুলনা থেকে রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনের চেইন টানায় হেনস্তার শিকার হন এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের শিক্ষার্থী মৃণ্ময় চক্রবর্তী। তবে অভিযোগ তখন অস্বীকার করে রেল কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২১ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দীন ঢাকা থেকে পদ্মা এক্সপ্রেসে রাজশাহী ফেরার সময় টিকিটবিহীন যাত্রা করায় লোকজনের কাছ থেকে ট্রেনের ভ্রমণকালীন টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) অনৈতিকভাবে ঘুষ নেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদ করায় টিটিইসহ কয়েকজন ফোরকানকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে জিএস সালাউদ্দীন আম্মারের নেতৃত্বে প্রায় ৮ ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করা হয়েছিল। সারাদেশের সঙ্গে রাজশাহীর রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। এ নিয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

বিএনপির নিন্দা
স্টেশনে ভাঙচুর প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘আমাদের রেলস্টেশনটা খুবই সুন্দর। এটিকে এভাবে ভাঙচুর করাটা মেনে নেওয়া যায় না। এটা খুবই নিন্দনীয়। আমরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি তাদের শান্ত করার। তবে তাদের মধ্যে মনে হয়েছে সবাই ছাত্র ছিল না। ছাত্র হলে এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে পারত না। ছাত্রদের অনেকে টিকিট কাটে না। অনেকে রেলের চেইন টেনে আটকে দেয়।’ 

জামায়াতের উদ্বেগ
সোমবার সকালে স্টেশন পরিদর্শন শেষে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, রাষ্ট্রীয় একটি সংস্থা দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে এইভাবে নির্যাতন করা উচিত নয়। ঠিক তেমনিভাবে এই স্টেশন ভবন রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এটা ভাঙচুর উদ্বেগজনক।’

আরও পড়ুন

×