ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাকে বাসায় নেওয়া হলো না লিমনের

আন্দোলনের মধ্যেই ঝরল আরও প্রাণ

মাকে বাসায় নেওয়া হলো না লিমনের

মাহাদী হাসান লিমন । ছবি: ফাইল

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ২০:২৭ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০০

গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থেকে ঢাকায় আসছিলেন মোসলেমা বেগম। গতকাল শনিবার ভোরে উত্তরার কামারপাড়া এলাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল তার। আর সেখান থেকে ছেলে তাকে বাসায় নিয়ে যাবে- এমনটাই পরিকল্পনা ছিল। মাকে আনতে মোটরসাইকেল নিয়ে রওনাও দিয়েছিলেন মাহাদী হাসান লিমন (২১)। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানো হয়নি মা-ছেলের। এর আগেই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কাওলা এলাকায় লরির ধাক্কায় লিমন গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এ পরিস্থিতিতে তার বন্ধুরা ফোন করে মোসলেমাকে মাঝপথ থেকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। শুক্রবার মধ্যরাতে ঘটে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা।

নিহত লিমন গ্রিন ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে শুরু হওয়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্যেই ঘটল এ দুর্ঘটনা। এর আগে ২৯ নভেম্বর রাতে রামপুরায় বাসচাপায় একরামুন্নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র মো. মাইনুদ্দিন মারা যান। আর ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় মারা যান নটর ডেম কলেজের  ছাত্র নাঈম হাসান। তার মৃত্যুর পর নতুন করে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। এদিকে রোড  সেফটি ফাউন্ডেশন নামে এক সংগঠন গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নভেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নটর ডেম কলেজের দু'জনসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৪ জন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

এ ছাড়া শুক্রবার রাতে রাজধানীর মিরপুর রোডের কলেজগেট এলাকায় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন এমদাদ হোসেন (৬০) নামে এক সংবাদকর্মী।

বিমানবন্দর সড়কে নিহত লিমনের বাবা সাবেক সেনাসদস্য মোফাজ্জল হোসেন সমকালকে জানান, উত্তরা-১০ নম্বর সেক্টরের কামারপাড়া এলাকার বাসায় থাকতেন লিমন। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস মিরপুরে। প্রতিদিন বাসে উত্তরা থেকে মিরপুরে যেতে কষ্ট হতো বলে তিনি মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার আবদার করেন। দেড় বছর আগে তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেন বাবা। তখন থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে চলাফেরা করতেন লিমন। শুক্রবার রাতে তিনি জিগাতলায় বোনের শ্বশুরবাড়িতে যান। এরপর রাত পৌনে ১১টার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে কামারপাড়ার উদ্দেশে রওনা হন। ভোরবেলা মা এসে পৌঁছাবেন, তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আগেই সেখানে উপস্থিত হতে চেয়েছিলেন লিমন। পথে কাওলা এলাকায় পদ্মা অয়েল পাম্পের সামনে রাত সাড়ে ১১টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে লিমনকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। সেখানে তাকে পরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান, আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

লিমনের মৃত্যুর খবর পেয়ে গতকাল তার অনেক সহপাঠী উপস্থিত হন ঢামেক মর্গের সামনে। সেখানে সহপাঠী খালিদ মাহমুদ টুটুল জানান, একটি লরি পেছন থেকে লিমনের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি ছিটকে রাস্তায় পড়ে গেলে লরির চাকা তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়।

নিহতের দূর সম্পর্কের মামা ইমাম হাসান জানান, কামারপাড়ার বাসায় লিমনের মা মোসলেমা বেগমও থাকতেন। মাসখানেক আগে তিনি গ্রামের বাড়ি পাঁচবিবির পশ্চিম দমদমায় যান। শুক্রবার রাত ১০টার বাসে তিনি জয়পুরহাট থেকে রওনা হয়েছিলেন। যমুনা সেতুর আগে একটি রেস্টুরেন্টে যাত্রাবিরতির সময় ছেলের বন্ধুরা তাকে ফোন করে বাড়িতে ফিরে যেতে বলেন। তাকে বলা হয়, তার ছেলে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। পরে ছোট ছেলে বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মাহফুজ হুসাইন তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ছেলের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন লিমনের বাবা মোফাজ্জল হোসেন। কয়েক বছর আগে তিনি অবসরে যান। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের হালিশহরে থাকেন এবং সেখানকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে লিমন ছিলেন দ্বিতীয়।

বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কায়কোবাদ কাজী সমকালকে বলেন, দুর্ঘটনায় দায়ী লরিটি জব্দ করেছে পুলিশ। তবে চালক পালিয়ে গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ঘটনাস্থলের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি বলেও তিনি জানান।

ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল সংবাদকর্মীর: রাজধানীর মিরপুর রোডের কলেজগেট এলাকায় ট্রাকচাপায় নিহত হয়েছেন সংবাদকর্মী এমদাদ হোসেন। শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে কলেজগেটের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তখন তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি আব্দুল লতিফ জানান, দৈনিক সংবাদে সম্পাদনা সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এমদাদ হোসেন। তিনি রাজধানীর ডেমরা এলাকায় থাকতেন। শুক্রবার শ্যামলী এলাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আত্মীয়কে দেখতে এসেছিলেন তিনি। এরপর বাসায় ফেরার পথে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই ট্রাক নিয়ে চালক পালিয়ে যান।

পুলিশ জানায়, স্বজনরা এ ঘটনায় কোনো মামলা বা অভিযোগ করতে চাননি। তারা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের অনুমতি চেয়েছেন। এ কারণে ময়নাতদন্তও হয়নি।

আরও পড়ুন

×