ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

'শিখন' এগোলেও পিছিয়ে শিক্ষার ধারণা

জাতীয় শিক্ষাক্রম

'শিখন' এগোলেও পিছিয়ে শিক্ষার ধারণা

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৯:৩৭ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৯:৫৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখার খসড়া অনুমোদন দিয়েছেন। শিক্ষা-সংশ্নিষ্ট মহলে এ বিষয়ে আলোচনার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ কমানো, যোগ্যতাভিত্তিক শিখন কার্যক্রম এবং প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক কোনো বিভাজন না রাখা। জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখা নিয়ে এই কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করব।

প্রথমত, জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখাটি বেশ দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর বেশকিছু গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। এ ছাড়াও জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কমিটি শিক্ষা-সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করেছে। সে অর্থে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখাটি প্রণয়নে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং উপাত্তভিত্তিক করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাক্রমের ভিত্তি হিসেবে প্রগতিবাদ ও পুনর্গঠনবাদকে মূল দার্শনিক ভিত্তির পাশাপাশি মনোবিজ্ঞানিক ভিত্তি এবং ঐতিহাসিক ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রণয়নের জন্য আন্তর্জাতিক যেসব বেঞ্চমার্ক যেমন, এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও সরকারের বিভিন্ন রূপকল্প; যেমন- রূপকল্প ২০৪১ আছে, তা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মূল্যবোধকে সমন্বিত রাখার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায়, শিখন-এর ধারণাকে ভিত্তি করে শিক্ষাক্রমের বর্তমান রূপকল্পটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। তা সত্ত্বেও শিখনের ওপর পরিপূর্ণ এই নির্ভরতা 'শিক্ষার' ধারণা ও উদ্দেশ্য ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারে। 'শিখন' ও 'শিক্ষা' এই দুটি ধারণাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাক্রমের রূপকল্পে 'শিখন'কে মূলত 'শিক্ষা' ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু 'শিক্ষার' ধারণা অনেক বিস্তৃত। শিক্ষার্থীদের শিখন যোগ্যতা অর্জিত হলেই তাতে শিক্ষার্থীর 'শিক্ষা' অর্জিত হবে, তা বলা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তা শিক্ষার্থীর 'শিক্ষামূলক' অভিজ্ঞতাকে নির্দেশ করে। যদিও শিক্ষাক্রমের রূপকল্পে প্রগতিবাদকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার প্রগতিবাদ ধারণা ও সনাতনী ধারণার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা কেমন আচরণ করবে, ক্লাসে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অংশগ্রহণ ও তাদের ভূমিকা কেমন হবে এবং ক্লাস থেকে কী শিখবে- এসব বিষয়ে এই দুই ধারার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। তবুও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার সনাতনী ও প্রগতিবাদ- উভয় ধারণায় 'শিক্ষার' ধারণা ও উদ্দেশ্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। এ ক্ষেত্রে জন ডিউর ব্যাখ্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, প্রগতিবাদ ধারণা যদিও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে নির্দেশ করে, তবুও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে 'ত্রুটি-শিক্ষামূলক' অভিজ্ঞতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। তার মানে হলো, সনাতনী শিক্ষার মতোই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায়ও শিক্ষার্থীদের 'শিক্ষিত' করে তোলার অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। 'শিক্ষিত' মানে এটা না যে, শিক্ষার্থীরা কিছু বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠবে। বরং শিক্ষিত মানে হলো শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ও নির্দিষ্ট জ্ঞানের ওপর তাত্ত্বিক ধারণা এবং কেন শিক্ষার্থীর চারপাশ পরিবর্তিত হচ্ছে, শিক্ষার্থীর মধ্যে তার কারণ অনুসন্ধানের ক্ষমতা থাকতে হবে। বিস্তৃত অর্থে, 'শিক্ষার' ধারণা হলো শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তরও বটে। সে কারণে একজন ব্যক্তিকে শুধু তার দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে শিক্ষিত বলা যাবে না। 'দক্ষতার' ধারণা প্রশিক্ষণের সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্কিত।

যদি শিক্ষার ধারণা ব্যক্তির রূপান্তরের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে 'শিখন' বা প্রচলিত শিক্ষককেন্দ্রিক বা শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক যে ব্যবস্থা তার মাধ্যমে তা অর্জন করা অনেক সময় কঠিন। কারণ শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ব্যবস্থাও পদ্ধতিগত নীতির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুকে অধিক মূল্য দেওয়া হয়। যেমন- যদি কোনো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষক 'স্বাধীন' নীতিগুলোতে (আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো 'লিবার্টি') বিশ্বাস করে এবং সেখানে যদি শিক্ষার্থীর কোনো আগ্রহ না থাকে, তাহলে সেখানে শিক্ষার্থীকে এই স্বাধীন নীতিসমূহ শিখনের ক্ষেত্রে শিক্ষকের মধ্যে নৈতিক সমস্যা তৈরি হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর আগ্রহ এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে যে অন্বেষণ তৈরি করতে চান, তার মধ্যে নৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

বর্তমান জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখায় যদিও পরীক্ষার মতো বিষয়কে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; কিন্তু শিখনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর দক্ষতা মূল্যায়নের যে ব্যবস্থা, তা মূলত শিক্ষার্থীরা কী শিখবে তার মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী কী মূল্য দেয়, সেটির মূল্যায়নের চেয়ে তার কিছু দক্ষতা মূল্যায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে কারণে শিক্ষার্থীর মধ্যে কতটা 'শিক্ষামূলক' শেখা বা চিন্তন শিল্প বা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার ক্ষমতা প্রসারিত হবে- সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। তাছাড়াও মূল্যায়নের এই প্রক্রিয়ায় একটি শ্রেণির সমস্ত শিক্ষার্থীকে যখন একই পরিমাপের ভিত্তিতে শিখন যোগ্যতার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে, তখন যে সমস্ত শিক্ষার্থী ধীরে শিখে তাদের শিখন যোগ্যতা অর্জনে ত্রুটি থেকে যেতে পারে। যেমন, কোনো শ্রেণিতে যারা শিক্ষকের কথায় কম সাড়া দেয়, তাদের ক্ষেত্রে যে দক্ষতা নির্ধারিত হয়েছে, সেগুলো তাদের দ্বারা অর্জিত না হলেও তারা 'শিক্ষিত' হয়ে ওঠেনি সেটা বলা যাবে না।

সব শেষে বলতে চাই, জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখাতে শিখনের ধারণা শিশুর বেড়ে ওঠার মনোবিজ্ঞানিক তাত্ত্বিক যে ভিত্তি তার ওপর গড়ে উঠেছে। এখানে শিশুর বেড়ে ওঠার সমাজবিজ্ঞানিক তাত্ত্বিক যে ভিত্তি, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে গার্ট বিয়েস্তার বক্তব্যকে বিবেচনায় নিতে চাই। তার মতে, শিশুকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করার জন্য 'সমাজ পুনর্গঠনিক' ধারণার প্রয়োগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। 'সমাজ পুনর্গঠনিক' ধারণায় শিক্ষার্থীর দক্ষতার পাশাপাশি সামাজিকীকরণ এবং শিক্ষার্থীর নিজের 'অধীনতা'কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

সর্বোপরি এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে কীভাবে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর মধ্যে নিজের অধীনতার প্রতি প্রলুব্ধ করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব প্রদানের বিষয়ে জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×