ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণে খুলল ট্রেনের দুয়ার

দক্ষিণে খুলল ট্রেনের দুয়ার

পরীক্ষামূলক ট্রেনযাত্রার পর আজ মঙ্গলবার পদ্মা সেতু দিয়ে রেল যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -ফোকাস বাংলা

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:৩০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০৫

পূরণ হচ্ছে আরেকটি স্বপ্ন। পদ্মা সেতু হয়ে চলবে ট্রেন। আজ মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু রেল সংযোগে ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করবেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুর পৌনে ১টায় বিশেষ ট্রেনে সরকারপ্রধান মুন্সীগঞ্জের মাওয়া স্টেশন থেকে যাবেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা স্টেশনে। এর মাধ্যমে রেলপথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আসবে রাজধানী ঢাকার কাছাকাছি। রেলপথে ঢাকা-খুলনার দূরত্ব কমবে ২১২ কিলোমিটার। স্বল্প সময়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।

চীনের ঋণে প্রায় ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার ব্রডগেজ সিঙ্গেল লাইন নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এই রেলপথের রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৭৭ কিলোমিটার চালু হচ্ছে আজ। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছর জুনে যশোর পর্যন্ত ট্রেন চলবে।

গত বছরের ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন প্রতীক্ষার পদ্মা সেতু। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বিতল এই সেতুর ওপরতলায় চলছে গাড়ি; নিচতলা দিয়ে চলবে ট্রেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপন শুরু হয়। পদ্মা সেতুর মতো পদ্মা রেল সংযোগও সরকারের অগ্রাধিকারের প্রকল্প। টাকার অঙ্কে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মেট্রোরেলের পর এটি তৃতীয় বৃহত্তম প্রকল্প। পদ্মা রেল সংযোগের উদ্বোধন উপলক্ষে সাজ সাজ রব পড়েছে পদ্মার দুই তীরে।

যেভাবে শুরু ট্রেনে পদ্মা পাড়ির স্বপ্ন

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুতে রেল চলাচল সুবিধা যুক্ত করার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের স্বপ্ন। অর্থায়ন জটিলতায় তা আটকে থাকে কয়েক বছর। চীনের ঋণ প্রতিশ্রুতিতে ২০১৬ সালে সরকারের অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। ট্রেন চালানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ওই বছরের এপ্রিলে চুক্তি সই হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের (সিআরইসি) সঙ্গে। প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি)।  
ঢাকা-ভাঙ্গা রেলপথের ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার নির্মাণ হয়েছে ভায়াডাক্টের ওপর। এটিই দেশের প্রথম উড়াল রেলপথ। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর এবং শরীয়তপুর জেলা রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে। আগামীতে যুক্ত হবে নড়াইল।


পদ্মা সেতুতে চলবে যেসব ট্রেন

গত ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ট্রেন চলে। এর সফলতায় আজ শুরু হচ্ছে আনুষ্ঠানিক ট্রেন চলাচল। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলে আরও কিছু দিন লাগবে। রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী সমকালকে বলেন, ‘ট্রেন চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। নির্দেশ পেলেই চালানো যাবে।’
পদ্মা সেতু হয়ে আপাতত তিনটি ট্রেন চালাবে রেলওয়ে। এগুলো হলো, ঢাকা-খুলনা রুটের সুন্দরবন এক্সপ্রেস, ঢাকা-যশোর রুটের বেনাপোল এক্সপ্রেস। রাজবাড়ী-রাজশাহী রুটের মধুমতি এক্সপ্রেসের চলাচল ঢাকা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। ইতোমধ্যে ট্রেনগুলোর নতুন ভাড়ার তালিকা প্রস্তাব করেছে রেলওয়ে, যা রেল মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। রেলের মহাপরিচালক কামরুল আহসান সমকালকে এর আগে জানান, ‘উদ্বোধনের সপ্তাহ তিনেক পর থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন চলবে।’
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অধীনে ১০০ বগি কেনা হয়েছে চীন থেকে। তবে আপাতত পুরোনো ট্রেনগুলোই চলবে। রেলের মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে যেসব ট্রেন চলছে, সেগুলোই আপাতত চলবে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরে নতুন ট্রেন চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
 

কমবে দূরত্ব, বাঁচবে সময়

ঢাকা-খুলনা এবং ঢাকা-যশোর রুটের ট্রেন অনেক ঘুরে গন্তব্যে যায়। কমলাপুর থেকে টঙ্গী, জয়দেবপুর, বঙ্গবন্ধু সেতু, ঈশ্বরদী, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে এ গতিপথ। পদ্মা সেতুতে চলাচল শুরুর পর কমলাপুর থেকে গেণ্ডারিয়া, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান, শ্রীনগর, মাওয়া, পদ্মা সেতু, ফরিদপুরের ভাঙ্গা হয়ে রাজবাড়ী দিয়ে গন্তব্যে যাবে। ঢাকা-রাজশাহী রুটের ট্রেনও চলতে পারবে এই পথ হয়ে। এতে খুলনা, রাজশাহী ও যশোরের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব কমবে।

বর্তমানে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ ঘুরে যশোরে ট্রেন যেতে রেলের সূচি অনুযায়ী সময় লাগে ৭ ঘণ্টা ৫০ মিনিট, যদিও ৯ ঘণ্টার কমে যাওয়া যায় না। কখনও কখনও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাও লেগে যায়। পদ্মা রেল সংযোগ পুরোপুরি চালুর পর এই পথ তিন ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়া যাবে। দূরত্ব সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার থেকে কমে হবে ১৬৯ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ ঘুরে খুলনা যেতে সময় লাগে ৯ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়া যাবে সাড়ে চার ঘণ্টায়। ঢাকা-কলকাতা রুটের ট্রেনও চলতে পারবে পদ্মা রেল সংযোগ হয়ে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলবে

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা অনুযায়ী পদ্মা রেল সংযোগে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বাড়বে। কমবে আঞ্চলিক অসমতা। পদ্মা রেল সংযোগে দ্বিতীয় ব্রডগেজ লাইন নির্মাণের সুবিধা রাখা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ডাবল লাইনে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে। ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ হলে এই পথের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

মোংলা থেকে খুলনা পর্যন্ত ৬২ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইনের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। যশোর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ শেষে মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে আমদানি-রপ্তানি পণ্য রেলে ঢাকায় আসার পথ খুলবে। দক্ষিণবঙ্গে অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা। সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা রেল সংযোগ হবে ট্রান্স এশিয়ান রেল নেটওয়ার্কের অংশ। এতে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন সুবিধা বাড়বে।

যা যা থাকছে পদ্মা রেল সংযোগে

১৬৯ কিলোমিটার ছাড়া আরও তিন কিলোমিটার মূল লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে প্রকল্পের অধীনে। ৪৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার সাইড এবং লুপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। সর্বমোট নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হচ্ছে ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার।
৬৬টি বড় সেতু নির্মাণ করা হয়েছে এই রেলপথে। ২৪৪টি ছোট সেতু এবং কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। মাওয়ায় একটি সড়ক ওভারপাসসহ ২৯টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণ করা হয়েছে। এ রেললাইন পুরো পথে কোথাও গাড়ি চলাচলে বাধা হবে না। ১৪টি নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পুরোনো ৬টি স্টেশনের খোলনলচে বদলে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। ঢাকা-পদ্মা সেতু-ভাঙ্গা অংশে স্টেশন সংখ্যা ৯টি। ২০টি স্টেশনই চলবে কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলক্ড সিগন্যাল পদ্ধতিতে। এক হাজার ৭৯৬ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে।
 

যেমন হবে উদ্বোধন অনুষ্ঠান

পদ্মা সেতুর মতো জমকালো না হলেও বর্ণাঢ্য হবে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের উদ্বোধন। রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে। বহুল কাঙ্ক্ষিত এ ট্রেন চলাচলের আগে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ফলক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে প্রধান অতিথি হিসেবে মাওয়া স্টেশন চত্বরে সুধী সমাবেশে ভাষণ দেবেন তিনি।

উদ্বোধন সফল করতে রেলমন্ত্রী, রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন প্রকল্প এলাকায়। স্থানীয় এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারাও রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে সড়কপথে মাওয়ায় যাবেন। সকাল ১১টায় শুরু হবে উদ্বোধন অনুষ্ঠান। চীন থেকে আনা বগি দিয়ে সাজানো হয়েছে উদ্বোধনী বিশেষ ট্রেন। পাওয়ার কারসহ ১৪টি বগি থাকবে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ট্রেনে। এসব বগিতে আমন্ত্রিত অতিথিরা সরকারপ্রধানের সহযাত্রী হবেন।

ট্রেনে ভাঙ্গা স্টেশনে যাওয়ার পর, সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী যাবেন স্থানীয় ড. কাজী আবু ইউসুফ স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগের জনসভায়। সেখানে ভাষণ দেওয়ার পর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পৈতৃক বাড়িতে যাবেন শেখ হাসিনা। সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। টুঙ্গিপাড়ার নিজ বাড়িতে রাত্রিযাপনের পর বুধবার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে সরকারপ্রধানের।



আরও পড়ুন

×