ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রাম গ্যাসশূন্য, ঘরে-বাইরে দুর্ভোগ অবর্ণনীয়

চট্টগ্রাম গ্যাসশূন্য, ঘরে-বাইরে দুর্ভোগ অবর্ণনীয়
×

প্রতীকী ছবি

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩৬ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৪ | ০০:৩৮

চট্টগ্রাম নগরীর বাদুরতলার বাসিন্দা জেসমিন আকতার শুক্রবার ভোরে ওঠে যান রান্নাঘরে। অন্যান্য দিনের মতো পরিবারের সদস্যদের নাশতা তৈরির জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেন। একবার, দু’বার– এভাবে কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফলাফল একই। হতাশ হয়ে আশপাশের বাসায় খবর নিলে, তারাও গ্যাস নেই জানান। বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার এনে সবাই নাশতা সারেন। জেসমিন আশায় ছিলেন হয়তো দুপুরে মিলবে গ্যাসের দেখা। কিন্তু রান্নার প্রস্তুতি নিয়ে পুনরায় চুলা জ্বালাতে গিয়ে দেখেন গ্যাস নেই। পরে স্বামীকে হোটেলে পাঠিয়ে মধ্যাহ্নভোজের পর রাতের খাবার আনিয়ে খেয়েছেন। ক্ষুব্ধ জেসমিন সমকালকে বলেছেন, কয়েক মাস ধরে গ্যাসের সমস্যা চলছে। মধ্যরাতেও রান্না সেরেছি। কিন্তু এই প্রথম পুরো দিন গ্যাস পেলাম না। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে খেতে হয়েছে। এভাবে আর পারছি না।

গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ থাকায় শুক্রবার জেসমিনের মতো গোটা চট্টগ্রামের ঘরে ও বাইরে মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। জানা গেছে, মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে বিপর্যয় নেমে আসে বন্দরনগরীতে।

গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আগে থেকে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রচার না করায় এ নিয়ে গ্রাহকদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ফলে রান্না করতে না পেরে অনেকে দোকান থেকে শুকনো খাবার কিনে খেয়ে দিন পার করেন। অনেক জায়গায় হোটেলে দীর্ঘ সময় লাইনে থেকে লোকজনকে খাবার সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো ঘিরে গাড়ির সারি এত বড় হয়, যেন দূর থেকে পিঁপড়ার সারি মনে হয়েছে। রাস্তায় সিএনজিচালিত গাড়ির সংকট থাকায় নগরীর মোড়ে মোড়ে শত শত মানুষকে কর্মস্থলে যেতে ও বাসায় ফিরতে অপেক্ষা করতে হয়। এ সুযোগে যাত্রীদের পকেটে কেটেছেন চালকরা।

গ্যাস সংকটে শুধু আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক নয়, বন্ধ হয়ে পড়ে নগরীর বিভিন্ন শিল্পকারখানা। বিশেষ করে চট্টগ্রামের সার কারখানা কাফকো, সিইউএফএল, শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গ্যাসনির্ভর সব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামের ৬৮টি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনসহ কয়েক হাজার বাণিজ্যিক এবং ৬ লাখের বেশি আবাসিক গ্রাহক কোনো গ্যাস পাননি। কেজিডিসিএলের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল ছাড়া বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ নেই। এ জন্যই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।

নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা দিলওয়ারা বেগম বলেন, ‘এমনিতেই গ্যাস সংকটে নিয়মিত রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। দিনের বেলায় গ্যাস থাকে না। মধ্যরাতে চুলা জ্বালাতে হয়। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে গ্যাস একেবারেই নেই। শুক্রবার তিন বেলায় হোটেল থেকে কিনে খেতে হয়েছে।’ বাদুরতলার বাসিন্দা ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘জুমা পড়ে হোটেলে গিয়ে দেখি খাবার শেষ। পরে কয়েকটি হোটেল ঘুরে একটিতে শুধু ভাত-সবজি পেয়েছি।’ অবশ্য কিছু কিছু পরিবার ঘরে মাটি ও বিদ্যুৎচালিত চুলায় রান্না করেছে।

শুক্রবার দুপুরে নগরীর বহদ্দারহাটে ‘হাজী বিরিয়ানি’ নামে খাবার দোকানে দেখা যায়, মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে বিরিয়ানি সংগ্রহ করছেন। দোকানি রেজোয়ান আহমেদ জানান, তারা সব সময় লাইনের গ্যাসে রান্না করেন। কিন্তু প্রায় দেড় দিনেও গ্যাস না পাওয়ায় তড়িঘড়ি করে সিলিন্ডার গ্যাস ও চুলা কিনে রান্না করে বিক্রি করছেন। এ জন্য দাম কিছুটা বেশি রাখছেন। এখানে এক প্লেট গরুর বিরিয়ানি অন্যদিন ১৮০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল তা ২০০ টাকা নিতে দেখা যায়। গ্যাস ঘিরে দুর্ভোগের একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর মুরাদপুর, চকবাজারসহ আরও কয়েকটি এলাকায়।

সংসার চলবে কীভাবে
এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন এক প্রকার বন্ধ ছিল নগরীতে। কিছু সংখ্যক অটোরিকশা চললেও দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করেছেন চালকরা। নগরীর বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত অটোরিকশার ভাড়া ১০০-১২০ টাকা হলেও গতকাল আদায় করা হয়েছে ২০০ টাকার বেশি। আবার অনেকেই গ্যাস না পেয়ে গাড়ি নিয়ে অলস সময় কাটিয়েছেন। 

বহদ্দারহাটে অটোরিকশা নিয়ে বসে থাকা মো. ইলিয়াস বলেন, ‘গাড়িতে তেমন গ্যাস ছিল না। শুক্রবার সকালে গ্যাস নেব ভেবেছিলাম। কিন্তু সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে গিয়ে গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখি। শেষ পর্যন্ত আর গ্যাস পাইনি। সারাদিন অলস কেটেছে। এভাবে চললে কীভাবে সংসার চালাব?’

শুক্রবার দুপুরে নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় একটি ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, শত শত অটোরিকশা অপেক্ষা করছে। অটোচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস পাইনি। কখন পাব, কেউই বলতে পারছে না। চাকা না ঘুরলে আমাদের হাঁড়িও জ্বলবে না।’

চট্টগ্রামে প্রতিদিন আবাসিক ও শিল্পকারখানা মিলিয়ে ৩২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে ২৮০ থেকে ২৯০ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়ায় সংকট চলছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

×