কৌতূহল ছাপিয়ে আঙুরে সাফল্য রুহুলের
ফুলবাড়ীর আজোয়াটারী এলাকায় বাগান পরিচর্যা করছেন রুহুল আমিন সমকাল
শাহিনুর রহমান শাহিন, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার মাটি ও জলবায়ুতে যে সুস্বাদু লাল আঙুর ফলানো সম্ভব, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন ব্যাংকার ও কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমীন। চাকরির পাশাপাশি জমি বর্গা নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন বহুদিনের স্বপ্নের আঙুর বাগান।
নিজ গ্রামে গংগারহাট বাজারসংলগ্ন আজোয়াটারী এলাকার দুই বিঘা জমিতে চাষ করা এই বিদেশি প্রজাতির ‘বাইনুর’ জাতের লাল আঙুর এখন শুধু ফুলবাড়ী নয়, পুরো জেলায় এক নতুন সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী, শৌখিন চাষিসহ সাধারণ মানুষ আসছেন এই আঙুর বাগান একনজর দেখতে এবং চারা সংগ্রহ করতে। সেইসঙ্গে তুলছেন সেলফি।
সংশয় উড়িয়ে রুহুল আমিনের ১০ বছরের নীরব সাধনার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৭ সালে ইউক্রেন ও রাশিয়ায় থাকা বন্ধুদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা উন্নত জাতের ৪০টি চারা দিয়ে এই বাগানের যাত্রা শুরু। রুহুল আমীনকে এই কাজে নিবিড়ভাবে সহযোগিতা করেন তাঁর ভাগনে হাসেম আলী। শুরুতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এই উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের অনেকেই করেছিলেন নানা কটাক্ষ। উদ্যোক্তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে সেসব সংশয় টেকেনি।
রোপণের মাত্র আট মাস পরই কয়েকটি গাছে আঙুর ধরতে শুরু করলে আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায় রুহুল আমিনের। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে এই বাগানে ৪৬০টি বাইনুর জাতের আঙুর গাছ রয়েছে, যার ডালে ডালে এখন শোভা পাচ্ছে থোকা থোকা ফল।
ধৈর্য আর সঠিক পরিচর্যায় প্রতিবছরই এই বাগানের ফলন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২০২২ সালে প্রথম ধাপে মাত্র ৫০টি গাছ থেকে প্রায় ৫ মণ আঙুর বিক্রি করা হয়। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ মণে, ২০২৪ সালে ১৫ মণ এবং ২০২৫ সালে চতুর্থ ধাপে ২০ মণ আঙুর বিক্রি হয়। চলতি ২০২৬ সালে এসে সাফল্যের গ্রাফ আরও উঁচুতে উঠেছে। এবার পঞ্চম ধাপে মাত্র ৬০টি আঙুর গাছ থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মণ আঙুর বিক্রির জোর সম্ভাবনা দেখছেন এই দুই উদ্যোক্তা। বিক্রির টাকা থেকে ভালো লাভ হবে বলে আশা তাদের।
বাগানটিতে শুধু বাইনুর জাতই নয়, আরও কিছু বিদেশি জাতের আঙুর এবং তিন শতাধিক দেশি-বিদেশি ফলদ গাছ রয়েছে। এখন পর্যন্ত দুই বিঘা জমির এই বাগানে প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে আঙুর ও চারা বিক্রি করে প্রায় ৬ লাখ টাকা ঘরে তুলেছেন তারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কৃষকদের কাছে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা দরে শত শত চারা বিক্রি হচ্ছে।
মাগুরা জেলা থেকে আসা সহকারী শিক্ষক ও শৌখিন উদ্যোক্তা রামপ্রসাদ জানান, সামাজিক মাধ্যমে এই সাফল্যের গল্প দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। প্রথম দফায় ২০টি এবং পরে আরও ১৫টি চারা নিয়ে তিনি নিজের বাড়ির ছাদ ও উঠানে রোপণ করেছেন এবং তার গাছেও এখন ফলন আসতে শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, এই দুই উদ্যোক্তার সাফল্য উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত কৃষি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং নতুন ফল চাষে তরুণদের আগ্রহী করতে এক অনন্য ভূমিকা রাখবে।
বেলে-দোআঁশ মাটির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের এই আঙুর বাগানটি এখন অনেকের কর্মসংস্থান ও প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াছমিন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, রুহুল আমীন ও হাসেম আলী ফুলবাড়ীসহ পুরো কুড়িগ্রাম জেলায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের বাগানের আঙুর যেমন সুস্বাদু, তেমনি ফলনও আশাব্যাঞ্জক। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এই বাগানকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- আঙুর