ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বগুড়ায় জমি অধিগ্রহণ

ঘুষ না দিলে ক্ষতিপূরণ পেতে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস

ঘুষ না দিলে ক্ষতিপূরণ পেতে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস
×

 লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ায় বিভিন্ন ধরনের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে ঘুষের ফাঁদে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় ক্ষতিপূরণের টাকার ৩ থেকে ৫ শতাংশ উৎকোচ দিলে দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি ও চেক পাওয়ার সুযোগ মিলছে। টাকা না দিলে একই কাজের জন্য ঘুরতে হচ্ছে মাসের পর মাস। দালালের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি এই চক্রে এলএ শাখার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও এসেছে।

সরেজমিন বেশ কয়েকদিন গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিপূরণের টাকা ও জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত সেবা নিতে এলএ শাখায় আসছেন। কেউ এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে ছুটছেন, কেউ বারান্দায় অপেক্ষা করছেন। একই প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ হলেও কারও ক্ষতিপূরণের চেক দ্রুত মিলছে, আবার কেউ মাসের পর মাস ঘুরছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা দেওয়ার সঙ্গে কাজের গতি বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

শেরপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকার শফিকুল ইসলাম এমনই একজন। তাঁর ৩ শতক জমি ও একটি টিনের স্থাপনা অধিগ্রহণ হয়েছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাঁর পাওয়ার কথা প্রায় ১০ লাখ টাকা। চার মাস ধরে এলএ শাখায় ঘুরছেন তিনি। এর মধ্যে হাপুনিয়া এলাকার আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তি অফিসের সামনে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। প্রথমে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচয় দিলেও পরে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন ওই ব্যক্তি। তাঁর দাবি, কর্মকর্তাদের ৩ শতাংশ এবং তাঁকে আলাদাভাবে কিছু টাকা দিতে হবে। কাগজপত্র দিলে ৩-৪ দিনের মধ্যেই চেক হাতে পাওয়া যাবে। শুধু প্রস্তাব দিয়েই থামেননি আলী হোসেন। টাকা কোথায় দিতে হবে, সেটিও জানান শফিকুলকে। তাঁর ভাষ্য, ডিসি অফিসের বাইরে সাতমাথার দিকে গিয়ে টাকা দিতে হবে। সেখানে সিসি ক্যামেরা নেই।

এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে গত ১৬ আগস্ট মোবাইল ফোনে ভুক্তভোগী সেজে যোগাযোগ করা হয় আলী হোসেনের সঙ্গে। প্রতিবেদককেও তিনি একই ধরনের প্রস্তাব দেন। কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে কাজ করবেন জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে ওই দালাল জানান, এলএ শাখার একজন কানুনগোর সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ওই কানুনগোর মাধ্যমেই কাজগুলো করে থাকেন।
আলী হোসেনের এমন দাবির সঙ্গে মিলে যায় আরেক ভুক্তভোগী আসমত আলীর অভিজ্ঞতাও। তাঁর অভিযোগ, পাশের জমির মালিক উৎকোচ দিয়ে আগেই ক্ষতিপূরণের চেক পেয়েছেন। পরে বাধ্য হয়ে তিনিও ৯০ লাখ টাকার চেকের বিপরীতে ৩ শতাংশ হারে দালালকে টাকা দেন। আশ্চর্যজনকভাবে দেখলেন টাকা দেওয়ার পরই তাঁর কাজ এগিয়েছে। 

নন্দীগ্রাম উপজেলার সামছুল আলমের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। একটি সেতু নির্মাণ প্রকল্পে তাঁর ১৭ শতক জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রায় দুই বছর ধরে এলএ শাখায় ঘুরছেন। চার-পাঁচ মাস আগে ৮ ধারা জারি হলেও ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। অথচ তাঁর এক প্রতিবেশী ৪ শতাংশ হারে টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নিয়েছেন। এলএ শাখার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামছুল আলম বলেন, টাকা না দিলে কাজ হচ্ছে না। যাঁর কাছে অভিযোগ দেবেন, সেখানেও যদি দুর্নীতি থাকে, তাহলে ভুক্তভোগীর যাওয়ার জায়গা থাকে না। শেষ পর্যন্ত তাঁকেও টাকা দিতে হতে পারে। তিনি যে টাকার চেক পাবেন সেখান থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হতে পারে। 

শুধু সেতু প্রকল্প নয়, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ-ঢাকা রেল প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বগুড়া সদর উপজেলার কৈচর দক্ষিণপাড়া এলাকার আমিনুল ইসলাম ও তাঁর বাবা আলহাজ আব্দুল গফুর সরদারের ৬ দশমিক ৭৫ শতক জমি এ প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ টাকা। গত ১৬ আগস্ট এলএ শাখার সামনে আমিনুল বলেন, দীর্ঘদিন ঘোরার পর এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসীম কুমারের সঙ্গে ৩ শতাংশ হিসাবে ৪২ হাজার টাকা এবং অতিরিক্ত ৩ হাজারসহ ৪৫ হাজার টাকায় কাজ করে দেওয়ার চুক্তি হয়। এর আগে তাঁকে বারবার কাগজ হারিয়ে গেছে বলে ঘোরানো হচ্ছিল। 
সরেজমিন অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগ থেকে এলএ শাখার সার্ভেয়ার অসীম কুমার সরকার, অফিস সহকারী নূর ইসলাম এবং কানুনগো মাসুদ রানাসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তারা। 

অসীম সরকার বলেন, ‘আমি কাউকে হয়রানি করিনি। চাকরি জীবনে কোনোদিন উৎকোচ নেওয়া বা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত নই। বাইরের দালাল কিংবা অন্য কেউ তাঁর নাম জড়িয়ে বলতে পারে।’ এসব অপকর্মের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন।

মাসুদ রানা দাবি করেন, আলী হোসেন নামের কাউকে তিনি চেনেন না। ১৬ আগস্টই প্রথম তাঁকে দেখেছেন। উৎকোচ নেওয়ার ঘটনা ঘটে থাকলেও তিনি এর সঙ্গে জড়িত নন। যে কেউ বাইরে তাদের নাম বলতেই পারে। ভুক্তভোগীদের উচিত কারও কথা বিশ্বাস না করা।

অফিস সহকারী নূর ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মানুষ বিভিন্ন কথা বলতেই পারে। কেউ অভিযোগ করলে তা সত্য হয়ে যায় না। অভিযোগ থাকলে ভুক্তভোগীদের প্রমাণসহ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো উচিত। 
সমকালের অনুসন্ধান চলাকালে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের নজরে এলে তিনি এলএ শাখার সামনে অভিযান করেন। সেখান থেকে হাতেনাতে দালাল আলী হোসেনকে ১৬ আগস্ট আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। 

তবে ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে থাকার অভিযোগের সবটাই যে ঘুষকে ঘিরে, তা নয়। প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণেও টাকা আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে। 
ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মুনিরা সুলতানা বলেন, আদালতের রায় থাকলেও বর্তমান সিএস বা আরএস রেকর্ড সরকারের নামে রয়েছে। রেকর্ড সংশোধন করে আনলে তিনি ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, প্রশাসন ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করলেও ভুক্তভোগীদের হয়রানির কারণে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দালালরা যদি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে সেবাপ্রার্থীদের কাছে টাকা দাবি করে, তাহলে তাদের তৎপরতা ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি কতটা আছে? প্রশাসনের উচিত অভিযোগকে হালকাভাবে না নিয়ে এসব প্রশ্নের সমাধান করা।

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে বগুড়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌফিকুর রহমান বলেন, ঘুষ বা পার্সেন্টেজ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই এবং এ ধরনের সুযোগও নেই। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানিমুক্ত রাখতে এলএ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও সেবাপ্রার্থীদের কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

×