নীরবে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা
যশোর অফিস
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সহকর্মীদের কাছে প্রাণবন্ত ও স্বপ্নবাজ হিসেবে পরিচিতি ছিল সাকিন হোসেনের। যশোরের ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ স্থানীয় দৈনিকে কাজ করতেন স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে। পাশাপাশি একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধিও ছিলেন। সংবাদ সংগ্রহের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত দিন কাটতো তাঁর। সাকিনের হাসিমাখা মুখের আড়ালে যে অজানা কষ্ট, মানসিক চাপ ও না পারা কথার ভার জমছে, তা যেন টের পাননি সহকর্মীরা। গত ১৬ জুলাই রাতে নিজের ঘরের আড়ায় ফাঁস নিয়ে জীবনের ইতি টানেন তিনি। এর আগে ফেসবুকে ‘বিদায় পৃথিবী’ লিখে স্ট্যাটাস দেন।
সদর উপজেলার শেখহাটি তরফ নওপাড়ার বাড়ি থেকে তাঁকে গুরুতর অবস্থায় স্বজনরা উদ্ধার করে নিয়ে যান যশোর জেনারেল হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর জেলার অভয়নগরের এক কিশোরী (১৬) কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তার বড় ভাইয়ের ভাষ্য, এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় তাকে বকুনি দিয়েছিলেন মা-বাবা। এতে অভিমান করে সে। সৌভাগ্যক্রমে চিকিৎসকদের চেষ্টায় বেঁচে যায় এই কিশোরী। এমন অনেকে আছেন, যাদের আর ফিরে আসা হয় না।
শান্ত, সবুজ ও উর্বর জেলা হিসেবে পরিচিত যশোরে নীরবে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। সংশ্লিষ্টরা বছেন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান এবং মানসিক অবসাদের মতো বিভিন্ন কারণে ক্রমে তারা আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছেন। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০২০ সাল হতে ২০২৫ সাল যশোরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ১৪ হাজার ৫১৬ জন। তাদের মধ্যে ৩৪৪ জন মারা গেছেন। দিনে গড়ে প্রায় সাতজন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করছেন।
মামলার হিসাব করলে দেখা যায়, গত ছয় বছরে যশোরে আত্মহত্যার ঘটনায় অপমৃত্যুর এক হাজার ৪৫৪টি মামলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) এই তথ্য বের করেছে। সংস্থাটির মতে, এই সংখ্যা দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা জেলায় এমন মামলা এক হাজার ৪০২টি। তৃতীয় স্থানে থাকা কুমিল্লায় মামলা হয়েছে এক হাজার ২৮৮টি।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ও মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ছয় বছরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ৯ হাজার ৬৬ জন নারী। বিপরীতে পুরুষের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৯০ জন। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ২২৭ জন নারী ও ১১৭ জন পুরুষ।
যশোর পুলিশের বিবরণীতে এ জেলায় গলায় ফাঁস, বিষপান, গায়ে আগুন, রেললাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার প্রবণতার তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি গলায় ফাঁস নেন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিষপানের পদ্ধতি।
কেন এই প্রবণতা বাড়ছে
সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের অবক্ষয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা ও মানুষের মনে জমে থাকা হতাশার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। প্রতি বছর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ঘিরে কিছু কর্মসূচির আয়োজন থাকলেও বছরের বাকি সময় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং থেকে যায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
সাকিনের বাবা রমজান আলী বলেন, পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে সাকিনের বনিবনা হচ্ছিল না। যে কারণে গত ঈদুল ফিতরের পরদিন তাঁর পুত্রবধূ বাবার বাড়িতে চলে যান। আর ফিরে আসেননি। এ নিয়ে সাকিন বিপর্যস্ত ছিলেন।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক মনে করেন, সমাজে নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা বা ‘অ্যানোমিক সুইসাইড’ প্রবণতা বাড়ছে। মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে হতাশা জন্ম নেয়। জীবনের লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকলে অনেকে নিজেদের জীবনকে অর্থহীন মনে করেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক সহায়তা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কাউন্সেলিংয়ে আগ্রহ নেই
মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার দেশের ১০টি জেলার হাসপাতালে ‘মনের বাড়ি’ নামের বিশেষ কর্নার স্থাপন করে কয়েক বছর আগে। ২০২৪ সালে যশোরের মনিরামপুর ও চৌগাছা এই কর্নারে চালু হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতার অভাব থাকায় এসব কর্নারে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কম। এসব কর্নারের বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন প্রচারণাও নেই।
মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাইকোথেরাপিস্ট ডা. এ এইচ এম মোস্তফা কামাল সৈকত বলেন, শুরুতে রোগী কিছুটা কম ছিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিযুক্ত হবার পর এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। দিনে এই ডেস্কে শতাধিক মানুষ আসছেন। আউটডোরে স্ক্রিনিংয়ের পর ২৫-৩০ জন রোগীকে তিনি মানসিক রোগের সেবা দিচ্ছেন।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, জেলার হাসপাতালগুলোতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা কম। এ কারণে যে চিকিৎসকেরা আছেন, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে মানসিক রোগীদের জন্য সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগে চালু থাকা টেলিমেডিসিন সেবা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তা পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকার ভাবছে।
- বিষয় :
- আত্মহত্যার চেষ্টা