ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনবল সংকটে তালা, দুই সাবস্টেশনে খামারিদের ভরসা হাতুড়ে চিকিৎসক

জনবল সংকটে তালা, দুই সাবস্টেশনে খামারিদের ভরসা হাতুড়ে চিকিৎসক
×

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় প্রতিটি পরিবারে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি পালন করা হয়। বিশেষ করে তিস্তা নদীর বিস্তীর্ণ চর এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত মিনি ডেইরি ও ছাগলের খামার। বিশাল এই প্রাণিসম্পদ রক্ষায় নিয়োজিত প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল এখন নিজেই জনবল সংকটের ‘রোগে’ আক্রান্ত। 

মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পুরো উপজেলার চিকিৎসাসেবা ও ডেইরি উন্নয়ন কার্যক্রম। তীব্র লোকবল সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে বামনডাঙ্গা ও ধর্মপুর উপকেন্দ্র (সাবস্টেশন)। ফলে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে নিরুপায় খামারি ও কৃষকেরা হাতুড়ে চিকিৎসক কিংবা অপচিকিৎসার ওপর ভরসা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মঞ্জুরীকৃত ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র পাঁচজন–একজন করে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (এসএএলও), ড্রেসার এবং অফিস সহায়ক। বর্তমানে প্রকল্পকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে সেবা সচল রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চলছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসক না পাওয়া, চরাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা পৌঁছাতে না পারা এবং নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার মতো অভিযোগ এখন নিত্যদিনের।

উপজেলার খামারি গ্রাম হিসেবে পরিচিত রামভদ্র খানের খামারি মামুন মিয়া জানান, বর্তমানে ফিড, ওষুধ ও শ্রমিকের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামার চালানো এমনিতেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে আবার রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি হলেও ফোন দিলে বা ডেকেও প্রাণিসম্পদ অফিসের লোক পাওয়া যায় না। একইভাবে ১০ বছর ধরে গরু পালন করা পৌর এলাকার বিদ্যুৎ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব হলেও প্রাণিসম্পদ অফিসে গিয়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না। তারা অফিসিয়াল কাজে বাইরে গেলে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়। সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।’

বামনডাঙ্গার নজরুল ইসলাম বা ধর্মপুর সাবস্টেশনের মো. ইউনিট মিয়াসহ কয়েকজন খামারি জানান, ‘সাবস্টেশন দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৫-২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। অসুস্থ পশু নিয়ে এতটা পথ অতিক্রম করে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।’ 

সবচেয়ে দুর্দশা পরিস্থিতিতে পড়েছেন তিস্তার চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। হরিপুর ডাঙ্গার চরের খামারি জরিফ মিয়ার অভিযোগ, চরে কোনো পশু অসুস্থ হলে ডাক্তারদের হাজার ডেকেও পাওয়া যায় না। তারা লোকবলের অজুহাত দেখিয়ে সদরের হাসপাতালে পশু নিয়ে আসতে বলেন, যা চরাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে একেবারেই অসম্ভব। চরের এই সংকট নিরসনে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায়নি।

দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চিকিৎসাসেবা দেওয়া বেলকা বাজারের পল্লী চিকিৎসক রাজেন্দ্র কুমার সরকার বলেন, বৈজ্ঞানিক ও খামারভিত্তিক পশু চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের বিকল্প নেই। অথচ খামারের তুলনায় সরকারি চিকিৎসকের সংখ্যা নগণ্য।

উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোজাম্মেল হক পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে জানান, মাত্র পাঁচজন লোক নিয়ে এত বড় উপজেলার সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে মাঠে গেলে বা অফিসিয়াল কাজে বাইরে থাকলে হাসপাতালে আসা রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়।

সদ্য যোগদান করা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরগঞ্জ একটি বৃহৎ উপজেলা এবং এখানে প্রাণিসম্পদের হার অনেক বেশি। সে তুলনায় জনবল অত্যন্ত নগণ্য। শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত জনবল বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন।’

আরও পড়ুন

×