ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধোপাজান বালু মহাল

সিসি ক্যামেরায় নজরদারির পরও থামেনি বালু ও পাথর লুট

সিসি ক্যামেরায় নজরদারির পরও  থামেনি বালু ও পাথর লুট
×

পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের অন্যতম বালু-পাথরমহালে ধোপাজানে লুট ঠেকাতে এবার সিসি ক্যামেরায় নজরদারি করছে পুলিশ। বালু-পাথরমহাল সিসি ক্যামেরায় নজরদারি দেশে এটিই প্রথম। তাতেও বালু লুট কিছুটা কমলেও লুটেরা চক্রকে পুরোপুরি নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়নি। 

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শেষ সীমানা ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমেছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা চলতি নদী। তার প্রবেশ মুখে জেলার একমাত্র বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারি ধোপাজান। স্থানীয়দের জীবন-জীবিকা আর পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধে আদেশ দেন আদালত। কয়েক বছর বালু উত্তোলন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুরু হয় হরিলুট। কয়েক দফায় লুটপাটে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয় সরকার। এ সময় লুট বন্ধ না করে উল্টো বিভিন্ন অভিযোগে প্রত্যাহার হন তৎকালীন এসপি আনোয়ার হোসেন। এরপর প্রশাসন তৎপর হলে ফের বন্ধ হয় বালু উত্তোলন।

বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও সরকারি সিদ্ধান্তে গেল বছরের অক্টোবর মাসে সরকারি সিদ্ধান্তে নদীতে চলে বালু উত্তোলন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাত্র এক কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ১ কোটি ২১ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি পায় বিআইডব্লিউটিএ। এরপর থেকে নদীর একাধিক স্থানে পরিবেশ বিধ্বংসী ড্রেজার আর বোমা মেশিনের তাণ্ডব চালায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং। অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই নদীসংলগ্ন এলাকার বসতভিটা, ফসলি জমি, বাঁধ, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ নানা স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ে। স্থানীয়রা নিজেদের বাঁচাতে আন্দোলন ও প্রতিবাদ শুরু করেন। এরপর লিমপেডের উত্তোলন বন্ধ হয়। বন্ধ হয়নি রাতের আঁধারে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু লুটের তাণ্ডব। সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ। ধোপাজান নদীর মুখে পুলিশের চেকপোস্ট বসিয়েও বন্ধ হচ্ছিল না বালুলুট। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ সদর থানার উদ্যোগে ধোপাজানে লুট ঠেকাতে পুলিশ চৌকির পাশাপাশি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি শুরু হয়েছে। বালু লুটেরা চক্র তাতেও থামেনি। তারা এবার গ্রামীণ বিভিন্ন সড়ক পথে ছোট ছোট যানবাহন দিয়ে বালু নেবার চেষ্টা করে। 

স্থানীয়রা বলছেন, আগে রাতে কিংবা বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নৌকায় করে বালু নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। পুলিশ চৌকিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পর নজরদারি বেড়েছে। ফলে অবৈধভাবে বালু পরিবহনে জড়িতদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
নদীতীরের বাদেরটেক গ্রামের আবু সাঈদ বলেন, রাতে চুরি করে অনেকে বালু নিয়ে যেতেন। এজন্য পুলিশ ক্যাম্পে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। এখন কেউ যাওয়ার সাহস করে না। পুলিশ ধরলে নৌকাসহ থানায় নিয়ে যায়। একই গ্রামের মহিনুর মিয়া বলেন, আগে চুপচাপে ম্যানেজ করে নৌকা দিয়ে বালু নিয়ে যাওয়া হতো। এখন সিসি ক্যামেরা লাগানোর কারণে সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ম্যানেজ করা এবং ম্যানেজ হওয়া দুটি বন্ধ হয়েছে।

এই গ্রামের এক তরুণ নাম গোপন রাখার শর্ত দিয়ে বলেন, এখনও মসজিদ, হাসপাতাল এসব প্রতিষ্ঠানের কথা বলে ১০ হাজার ফুট বালুর অনুমতিপত্র নিয়ে এক লাখ ফুট নেওয়ার চেষ্টা হয়।
ধোপাজান নদীর পুলিশ চৌকিতে বুধবার দায়িত্ব পালনকারী এএসআই জহিরুল বলেন, কোনো নৌকা যদি তাদের নজরদারি এড়িয়ে চলে যায়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে নৌকাটি শনাক্ত করে ধরা সম্ভব। নৌকাটি কেমন ছিল বা সেখানে কারা ছিল, সেই ছবি ফুটেজ দেখিয়ে আশপাশের মানুষের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া যাবে। 
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সহসভাপতি খলিল রহমান বলেন, সুনামগঞ্জের বালু-পাথর নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে এবং সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বশীলদের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাও রয়েছে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেই আস্থাহীনতার জায়গায় আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ এ সম্পদের সঙ্গে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি রতন সেখ বলেন, ‘ধোপাজান নদীর মুখে লাগানো অত্যাধুনিক ক্যামেরা আমার মোবাইলের সঙ্গে কানেক্টিং রয়েছে। ওখান দিয়ে কোনো কিছু এলেই আমার মোবাইলে পাঁচ সেকেন্ডের ভিডিও চলে আসে। এসপি সাহেবও এ বিষয়টি মনিটর করেন। বিদ্যুৎ না থাকলেও ক্যামেরা চলবে। ওখান থেকে ফুটেজ আসবে। পুলিশ চৌকিতে কেউ অপকর্ম করারও সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে ওখানকার একজন কনস্টেবলকে ক্লোজ করা হয়েছে।’

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বললেন,   পুলিশ সম্প্রতি বালু লুটের ঘটনায় ৬৬টি মামলায় ৭৪১ জনকে আসামি করেছে। পুলিশ ৬০ জনকে হাতেনাতে ধরেছে। তবে কোনো আসামিই হাজতবাস করেননি। আইনের ফাঁক-ফোকরে তারা বেরিয়ে গেছেন। এ অবস্থায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে টাস্কফোর্স গঠন করে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। বেআইনি কাজ যারা করবে তাদের শাস্তিও তখন সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হবে।’

আরও পড়ুন

×