‘ভাঙতে থাকলে মুছে যাবে চর খোলাবাড়িয়া গ্রাম’
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতীর ভাঙন থেকে রক্ষার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনের একাংশ। গতকাল বৃহস্পতিবার চর খোলাবাড়িয়া এলাকায় সমকাল
আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধুমতী নদীর ভাঙন থেকে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চর খোলাবাড়িয়া গ্রাম রক্ষার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রামের পাশে বয়ে যাওয়া নদীর তীরে আয়োজিত মানববন্ধনে এমন দাবি তোলেন তারা। বক্তারা জানান, এরমধ্যে ভাঙনে দুইটি মসজিদ, প্রায় ৫০০ একর জমি, ১২০-১৩০টি বসতঘরসহ বেশ কিছু স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
চর খোলাবাড়িয়া গ্রামটি উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নে পড়েছে। এই গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া চলতি বছর নদীভাঙনে পাঁচ একর ফসলি জমি ও চারটি বসতঘর হারিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, এখন অন্যের জমিতে কোনোমতে ঘর তুলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুস ছত্তার মিয়ার দুই একর ফসলি জমি ও তিনটি ঘর গেছে নদীতে। একইভাবে ফসলি জমি ও বসতঘর হারিয়েছেন বলে জানান অন্তত ২০ জন কৃষক। তারা বলছেন, বাপ-দাদার ভিটে ছাড়তে চান না কেউ। এ কারণে মধুমতীর তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
সাম্প্রতিক ভাঙনে নদী এগিয়ে আসায় ঝুঁকিতে পড়েছে এনডিসি আল হেরা দাখিল মাদ্রাসা, দিগনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর খোলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি সাব-পোস্ট অফিস, একটি এতিমখানা, ছয়টি মসজিদ, ফসলি জমি, বসতঘর। স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বর্ষায় নদীতে ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাদ্রাসার সামনে জিও ব্যাগ ফেলেছিল। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় ছিল কম। চলতি মৌসুমে জিও ব্যাগসহ বেশ কিছু জায়গায় নদীতে তলিয়ে গেছে।
সরেজমিন গতকাল বৃহস্পতিবার দেখা গেছে, আল হেরা দাখিল মাদ্রাসার মাত্র ৪০ গজ দূরে এখন মধুমতী। যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে জরুরি ব্যবস্থা না নিলে কয়েকদিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে বিলীন হতে পারে।
মাদ্রাসাটির দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল জব্বার ও ফাতেমা খানমের দেওয়া তথ্যমতে, এক মাস আগেও নদী অনেক দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে নদী মাদ্রাসার কাছাকাছি চলে এসেছে। এক মাস পর তাদের ফাইনাল পরীক্ষা। এর মধ্যে যদি মাদ্রাসাটি ভেঙে যায়, তাহলে তাদের ভয়াবহ ক্ষতি হবে।
এই মাদ্রাসায় প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী আছেন জানিয়ে সুপার মো. আব্দুর রব জানান, ‘আমাদের মাদ্রাসা থেকে মাত্র ৪০ গজ দূরে রয়েছে। আমরা এখন চর ঝুঁকির মধ্যে দিন পার করছি। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা না হলে এ অঞ্চলের শিক্ষা পিছিয়ে পড়বে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়েক গ্রামের প্রায় দুই হাজার মানুষ মানববন্ধন করেছেন।’
এলাকাবাসীর ভাষ্য, গত তিন বছর ধরে মধুমতী তীরে টানা ভাঙন চলছে। এতে চর মাকড়াইল গ্রামের প্রায় পুরোটা বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে চর খোলাবাড়িয়া গ্রামটিও মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। তারা ভাঙন রোধে চায় স্থায়ী সমাধান।
চর খোলাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আলমগীর খান বলেন, তাঁর বিদ্যালয় থেকে নদীর অবস্থান প্রায় ৬০ গজ দূরে। এখানে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী। তিনি ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
দিগনগর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায়ও তিন বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে। গত বছর ভাঙন রোধে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। এ বছর সেটাও বিলীন হয়ে গেছে। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।’
একই দাবি জানান বুড়াইচ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারমান আব্দুল ওহাব পান্নু। তিনি বলেন, এ ইউনিয়নের দিগনগর, চর খোলাবাড়িয়া ও চর মাকড়াইল গ্রাম তিনটি নদীতে বিলীন হতে বসেছে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তারা এর স্থায়ী সমাধান চান। তাঁর আশঙ্কা, চলতি বছর যেভাবে নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে, এতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শত শত বসতঘর ও কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাবে। এরমধ্যে বেশ কিছু বসতঘর ও ফসলি জমি ভাঙনের শিকার হয়েছে।
ইউএনও (চলতি দায়িত্ব) সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেএম রায়হানুর রহমান এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদী। আর জরুরি ভিত্তিতে পাউবোর সঙ্গে কথা বলে জিও ব্যাগ ফেলার ব্যবস্থা করবেন।
ফরিদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন ভাঙনকবলিত জায়গায় জরুরি ভিত্তিতে শিগগিরই জিও ব্যাগ ফেলার আশ্বাস দেন। এই কর্মকর্তা স্বীকার করেন, এখানে স্থায়ী বাঁধ করতে সময় লাগবে।
- বিষয় :
- নদী