ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিদ্যুৎ সংকট

কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, প্রভাব পড়ছে গৃহস্থালিতেও

কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, প্রভাব পড়ছে গৃহস্থালিতেও
×

ফাইল ফটো

 ফয়সল আহমদ বাবলু, সিলেট

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৬ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে চারটা। সিলেট নগরীর গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীর তামাম পিভিসি ইন্ডাস্ট্রির মেশিনগুলো তখনও ঠান্ডা। কারণ হিসেবে জানা গেল, সকাল থেকে চতুর্থবারের মতো বিদ্যুৎ চলে গেছে। শ্রমিকরা বসে আছেন। তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। কখন বিদ্যুৎ আসবে কেউ জানে না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্ষতিতে পড়তে হবে এই আশঙ্কায় সময় কাটে এখানকার শিল্প উদ্যোক্তাদের। 

এই অবস্থা শুধু তামাম পিভিসি ইন্ডাস্ট্রির নয়, একই অবস্থা গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরীর ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ আর কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির প্রায় ৪০টি কারখানার। স্বাভাবিক নিয়মে এসব কারখানায় দৈনিক আট ঘণ্টা উৎপাদন চলার কথা। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে দিনে ৭ থেকে ৮ বার লোডশেডিং আর কোনো কোনো দিন টানা ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকার কারণে কার্যত ৪-৫ ঘণ্টার বেশি মেশিন চালানো যাচ্ছে না।

তামাম পিভিসি ইন্ডাস্ট্রির যান্ত্রিক প্রকৌশলী মোকাদ্দেস হোসেন বলেন, ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানেরই একই রকম ক্ষতি হচ্ছে। তাই শিল্পাঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগর ও আশপাশের শহরাঞ্চলে পিডিবির আওতায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৭০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট। জেলা ও উপজেলাগুলোতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় চাহিদা প্রায় ৩০৭ মেগাওয়াট। এ অবস্থায় জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১৪০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ সংকটের আঁচ লেগেছে স্বাস্থ্যসেবায়ও। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি ডা. নাসিম হোসেন বলেন, বড় হাসপাতালগুলোতে তেমন সমস্যা না হলেও ছোট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ঠিকমতো সেবা দিতে পারছে না।

বিদ্যুতের প্রভাব পড়েছে পানি সরবরাহেও। নগরীর বাগবাড়ি, মদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা, কালীবাড়ি, হাওলাদারপাড়া, শিবগঞ্জ, রায়নগর, কুমারপাড়া, ঝরনারপাড়, শেখঘাট, চালিবন্দর, কামালগড়, ছড়ারপাড়, লামাবাজারসহ ৪২টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা পানির সংকটে ভুগছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গৃহস্থালি কাজও। 

সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর সমকালকে বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো পাম্প চালানো যাচ্ছে না। সবক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়ছে।

ভোল্টেজের অস্বাভাবিক ওঠানামাও কারখানার জন্য আরেক দুর্ভোগ আখ্যা দিয়ে বিসিক শিল্প মালিক সমিতি সিলেটের সভাপতি আলীমুল এহছান চৌধুরী সমকালকে বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে বারবার ভোল্টেজ ওঠানামা করছে। এতে একদিকে ঠিকমতো মেশিন চালানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে মেশিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, গত কয়েক মাসে মেশিন বিকল হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে উদ্যোক্তাদের, আর এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

উদ্যোক্তারা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়, আবার ভোল্টেজ কমে গেলে বা ওঠানামা করলেও মেশিন সচল রাখা যায় না। দীর্ঘ সময় এমন পরিস্থিতি চললে যন্ত্রাংশ পুড়ে যায়, তখন মেরামত বা নতুন যন্ত্রাংশ কিনতে বাড়তি অর্থ গুনতে হয়। সব ধরনের মেশিন জেনারেটরে চালানোও সম্ভব নয়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, সরকারি কর ও কারখানার নিয়মিত খরচ মেটানোর ওপরও।

সমস্যার সমাধান চেয়ে বিসিক শিল্প মালিক সমিতি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত আবেদন করেছে। আবেদনে গোটাটিকর শিল্পনগরীর দৈনিক ৭-৮ বার বিভ্রাট ও ৩-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বিসিক শিল্পনগরী গোটাটিকর এর উপমহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার ম. সুহেল হাওলাদার সমকালকে বলেন, তার বিসিকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন। তিনি জানান, উদ্যোক্তারা সময়মতো বিদ্যুৎ না পেয়ে তাঁর কাছে বারবার নালিশ করছেন। তিনি তাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন।

তবে অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করলেন না বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সিলেটের (বিপিডিবি) প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন। তিনি বলেন, সিলেটের সার্বিক অবস্থা এখনও অন্য স্থানের চেয়ে অনেক ভালো। 

ইমাম হোসেন আরও বলেন, বর্তমানে সিলেটে বিদ্যুতের খুব একটা সংকট নেই। বিভাগের চার জেলার পিডিবি গ্রাহকদের গড় চাহিদা ২৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৯০ শতাংশ সরবরাহ মিলছে।

আরও পড়ুন

×