কান্ডারিহীন হাওরের ৬৫% বিদ্যালয়
বিজয় কর রতন, মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার সদর ইউনিয়নে অবস্থিত কুতুব মসজিদপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ২৩০ জন। বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক আছেন তিনজন। বাকি দুটি পদ শূন্য। কয়েক মাস ধরে এখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সহকারী শিক্ষক সারোয়ার আলম। গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, সারোয়ার আলম ও অন্য সহকারী শিক্ষক দেবশ্রী মজুমদার শিক্ষার্থীদের হাজিরা নিচ্ছেন।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে সালমা আক্তার। সালমা জানিয়েছে, সে প্রতিদিনই ক্লাস করতে আসে। কিন্তু একজন শিক্ষককেই ২-৩টি করে ক্লাস নিতে হয়। এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক শংকর রায় বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে এখানে পড়াশোনা কম হয়। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সাজিদুর রহমানের বাবা মো. মাসুম মিয়ার দাবি, তাদের সন্তানের লেখাপড়া ঠিকমতো হয় না। দ্রুত সময়ের মধ্যে শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
একই চিত্র কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অধ্যুষিত তিন উপজেলা অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনে। এসব উপজেলার ২৪ ইউনিয়নে বাস করেন প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ। তাদের সন্তানদের শিক্ষায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২৩০টি। এর বাইরে ৩০টির মতো বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে ৪৬ হাজার ৪২৯ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সংকটে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষা বেহাল। ৬৫ শতাংশ স্কুলে প্রধান শিক্ষক এবং প্রায় ২২ শতাংশ সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য।
১৪, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে এসব তথ্য জানা গেছে। ২৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন ৮১ জন। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের ১৪৯টি পদ। ১ হাজার ১৫১টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৪৪ জন। শূন্য পদের সংখ্য ১০৭টি। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে ‘চলতি দায়িত্ব’ ও ‘অতিরিক্ত দায়িত্বের’ বোঝা বইছেন ১৪৯ জন সহকারী শিক্ষক। এ হিসাবে সহকারী শিক্ষকের পদ মূলত ২৫৬টি খালি। এ কারণে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
অষ্টগ্রামের ৮৩টি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭ হাজার ৩০০। প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন ২৫ জন। শূন্য ৫৩টি। ৪১০টি সহকারী শিক্ষক পদের মধ্যে ১৯টি শূন্য রয়েছে। তবে প্রধান শিক্ষক পদে ৫৩ জন সহকারী শিক্ষক অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমানের ভাষ্য, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিবিষয়ক মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে বহু বছর ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। গত জুলাইয়ে সেই মামলার রায় হয়েছে। শিগগিরই শূন্যপদ পূরণ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
১৪ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় ইটনার ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায় মাত্র দুজন শিক্ষককে। একজন প্রথম শ্রেণিতে ও অন্যজন তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছেন। তৃতীয় শ্রেণির ৪২ শিক্ষার্থীর একজন রিমা দাস আসে নৌকায় করে। এই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানায়, অনেক সময়ই শিক্ষকরা দেরি করে আসেন। তারা বাড়ি ফিরে তাদের প্রাইভেট পড়তে হয়।
এখানে ভজন দাসের এক ছেলে ও এক মেয়ে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। অনেকেই নিজ নিজ ব্যবসায়
ব্যস্ত থাকেন।
ছয় মাস ধরে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনকারী সুপ্রজিৎ দাস চৌধুরী বলেন, ‘আমার স্কুলে ২২০ জন ছাত্র-ছাত্রী। ছয়জন শিক্ষকের জায়গায় চারজন আছেন। মাঝেমধ্যেই আমাকে উপজেলা অফিসে যেতে হয়। সে সময় তিন শিক্ষকের পক্ষে নিয়মিত পাঠদান কষ্টের হয়ে যায়। তার পরও পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ দরকার।’
এ উপজেলার ৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৪ হাজার ৬২৯ জন। প্রধান শিক্ষকের ৪৬টি পদ শূন্য, কর্মরত আছেন ২৬ জন। ৩৭২টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ২৮টি পদ খালি। দুটি সহকারী শিক্ষক পদে মামলা চলছে। তবে প্রধান শিক্ষক পদে ৪৬ জন সহকারী শিক্ষক অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
মিঠামইন কাটখাল ইউনিয়নের হাসিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চার শিক্ষকের জায়গায় আছেন শুধু প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন। ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে গিয়ে তাঁকেই বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ২৩৪ শিক্ষার্থীকে সামলাতে হচ্ছে তাঁকে একাই। সম্প্রতি দুজন খণ্ডকালীন শিক্ষক দেওয়া হয়েছে। তারা ক্লাস নেন।
এদিন বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণির কমল মিয়া নিজের নামই বানান করে বলতে পারেনি। এ সময় আরমান মিয়া নামে এক অভিভাবক বলেন, ‘পুলাপাইন সকালে স্কুলে আইয়ে, দুপুরে বাড়িত যায়। কিতা পড়ায় আমরা বুঝি না। খালি কয়, খাতা লাগব, কলম লাগব।’ প্রধান শিক্ষক ভাষ্য, ‘আমাকে উপজেলায় মাসিক সভায় থাকতে হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক পদায়ন না হলে এই সংকটের সমাধান হবে না।’
এ উপজেলায় ৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৪ হাজার ৫০০ জন। ৭৫ জন প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৫ জন। ৩৫০টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ৬০টি শূন্য। তবে প্রধান শিক্ষক পদে ৫০ জন সহকারী শিক্ষক অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করছেন।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদের ভাষ্য, শিক্ষক সংকটের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে ক্লিয়ারেন্স এলে অধিদপ্তর থেকে পদায়ন শুরু হবে। নিয়োগ ও বদলি সমন্বয়ের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
- বিষয় :
- শিক্ষা