সাত দিনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব ২৫ পরিবার
উলিপুর উপজেলার দক্ষিণ দলদলিয়া গ্রামে তিস্তার ভাঙনের হুমকিতে বসতবাড়ি, গাছপালা, ফসলি জমিসহ প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা সমকাল
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভাঙনের নির্মম শিকার ৭০ বছরের আবেদ আলী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন তাঁর সর্বস্ব হারানোর গল্প, ‘হামার এতি যদি নদীটা বাঁদিল হয়, মোড় বাড়িয়াটা ভাঙ্গিল না হয়। বাপ-দাদার বাড়ি ভিটা জমিজমা এক আইতেই ভাঙ্গি নিয়া গেল। এক দিনে ফকির হয়া গেছি বাহে।’
৬৫ বছরের আব্দুল বাতেনের কণ্ঠেও একই হাহাকার, ‘আইতোত ভাঙন শুরু হইছে, দিনের ১২টা নাগাদ মোড় বাড়িটা নদীতে চলি গেল। খালি ঘর ২টা ভাঙি সরাইছি, আর কিছুই বাঁচপার পাই নাই। আগে আছিলং গিরস্থ, এখন হইলাম নদীভাঙা মানুষ।’
আবেদ আলী আর বাতেনের মতো গৃহহীন তৈয়ব আলী, জহুরুল হক, মফিজল হক, জাকির হোসেন, বজরুল হক ও ফজলুল হক পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে কোথায় যে ভেসে গেছেন, তা কেউ বলতে পারছেন না।
সাত দিন ধরে উলিপুর উপজেলার দক্ষিণ দলদলিয়া লাল মসজিদপাড়া, হিন্দুপাড়া, ডাক্তারপাড়া ও গোড়াই পিয়ার গ্রামে তিস্তার তীব্র ভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে ২৫টি পরিবার। ইতোমধ্যে ১০টি বসতবাড়ি, গাছপালা, ফসলি জমি এবং প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়েছে।
বর্তমানে দক্ষিণ দলদলিয়া ও গোড়াই পিয়ার গ্রামের পাঁচ শতাধিক পরিবার, নালাড়চর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঐতিহ্যবাহী লাল মসজিদ এবং বাঁধের রাস্তা হুমকির মুখে। এর আগে ১০ বার ঘর ভাঙার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় শাহজাহান আলীর। হতাশা প্রকাশ করে তিনি জানান, থেতরাই থেকে বজরা ইউনিয়ন পর্যন্ত বালু-সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে যেভাবে তীর বাঁধা হয়েছে, সেভাবে এই অংশটুকু না বাঁধলে তাদের শেষ সম্বলটুকুও রক্ষা পাবে না। ওবায়দুর রহমান, হায়দার আলী, মাঈদুল ইসলামসহ স্থানীয়দের একই দাবি।
ঐতিহ্যবাহী লাল মসজিদের ইমাম মো. মজিবর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বহু পুরোনো এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নদীতে তলিয়ে যাবে। নালাড়চর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, নদীর যে ভয়াল রূপ তারা দেখছেন, তাতে যে কোনো মুহূর্তে স্কুলটি তিস্তার পেটে চলে যেতে পারে। এতে থমকে যাবে শত শত শিশুর পড়াশোনা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তায় স্থানীয় ভুক্তভোগীরা ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেদের গাছের ডালপালা ফেলে নদীভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলদলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার তাগিদ দিয়েছেন। তবে উলিপুরের স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান সালেহী ভাঙন প্রতিরোধে পাঁচ হাজার জিও ব্যাগের অনুরোধ জানিয়ে চাহিদাপত্র বা ডিও লেটার দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান জানান, জেলা কার্যালয়ে জিও ব্যাগের বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এখনও অনুমোদন মেলেনি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন করে জিও ব্যাগ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের হাত-পা বাঁধা।
উদ্বেগ প্রকাশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ. টি. এম. আরিফ জানান, তিনি এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন এবং জিও ব্যাগের ব্যবস্থা করতে নির্বাহী প্রকৌশলীকে অনুরোধ করেছেন। দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা না গেলে এত বড় লোকালয় ও সরকারি স্থাপনা রক্ষা করা কোনোভাবে সম্ভব হবে না।
- বিষয় :
- পরিবার