ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আউটলেট বন্ধের পরও এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের আমানতের টাকা আত্মসাৎ

আউটলেট বন্ধের পরও এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের আমানতের টাকা আত্মসাৎ
×

নান্দাইলে গতকাল বুধবার আমানতের টাকা ফেরত চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন গ্রাহকরা সমকাল

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৯ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

নান্দাইল উপজেলার শিয়ালধরা বাজারে ২০২০ সালে চালু হয় অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট (অগ্রণী দুয়ারি ব্যাংকিং)। পরে ২০২৫ সালের জুন মাসে কর্তৃপক্ষ সেটি বন্ধ করে দেয়। এই তথ্য গ্রাহকদের না জানিয়ে লেনদেন অব্যাহত রাখে আউটলেট কর্তৃপক্ষ। এভাবে গ্রাহকদের কয়েক কোটি টাকার আমানত আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে শিয়ালধরা বাজারে আউটলেটের সামনে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। সেখানে কয়েকশ গ্রাহক আমানতের টাকা ফেরত পাওয়াসহ জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রাহকদের বেশির ভাগ প্রবাসী পরিবারের সদস্য। আউটলেটে সঞ্চয়পত্র কেনাবেচার কোনো নিয়ম না থাকলেও তারা (স্বজনরা) আউটলেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স আমানত রেখেছিলেন। কেউ কেউ আবার লাখ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রও কিনেছিলেন। টাকা জমা বা সঞ্চয়পত্র বিক্রির নামে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তদারককারী অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, কালীগঞ্জ বাজার শাখার নামে ভুয়া ব্যাংকিং রশিদ দেওয়া হয়েছে।

গ্রাহক শামসুন্নাহার জানান, তাঁর স্বামী সুজন মিয়া দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। সেখান থেকে তাঁর স্বামী দেশে টাকা পাঠাতেন। তিনি সেই টাকা দিয়ে ওই এজেন্ট ব্যাংক থেকে ২৪ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। এখন জানতে পেরেছেন এজেন্ট ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রাহকদের কোনো কিছু না জানিয়ে কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে কিভাবে এজেন্ট ব্যাংকটি বন্ধ করতে পারেন? এখন গ্রাহকরা যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন তাঁর প্রতিদান কে দেবে? সেখানে উপস্থিত সুজন মিয়া বলেন, টাকা ফেরত চাইলে গেলে এজেন্ট ব্যাংকের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম মিজান তাঁর বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা করেছেন।

জাহাঙ্গীর আলম নামে একজন গ্রাহক জানান, তিনি ওই অগ্রণী এজেন্ট ব্যাংক শাখায় ১৪ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত রেখেছিলেন। এখন বুঝতে পেরেছেন তিনিও প্রতারণার শিকার হয়েছেন, কেননা তিনিও তাঁর টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, তার প্রতিবেশী আরও তিনটি পরিবার ৪৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনে এখন ফকির হওয়ার পথে। শুধু তাই নয় আশপাশের গ্রামের প্রায় হাজারো বাসিন্দা অগ্রণী এজেন্ট ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছিলেন। তারা কেউই এখন আর টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। 

সোহেল মিয়ার ভাষ্য, তিনি এখান থেকে ৯ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। তাঁকে বলা হয়েছিল ডিসেম্বর মাসে লভ্যাংশসহ আসল টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এখন তো পুরো টাকাই গচ্চা যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শোভা খাতুন বলেন, তিনি ওই ব্যাংকে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা রেখেছিলেন। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় এখন টাকার জন্য পরিচালকের বাড়িতে গেলে গালাগাল শুনতে হয়।

পারুল আক্তার জানান, তাঁর ২০ লাখ টাকারও কোনো হদিস পাচ্ছেন না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের উচিত গ্রাহকদের জমা টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা। অন্যথায় ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না।

একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুন মাসে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধ করে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রতারক চক্রটি তা গোপন রেখে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ব্যাংকের সেই সাইনবোর্ডটি চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত টানানো ছিল বলে নিশ্চিত করেছেন বাজারের ব্যবসায়ীরা। তাই গ্রাহকরা নির্দ্বিধায় ব্যাংকিং লেনদেন চালিয়ে গেছেন। এই দায় কার তা নিয়ে প্রশ্ন করছেন গ্রাহকরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি এজেন্ট ব্যাংক হঠাৎ বন্ধ করে দিলেও স্থানীয়ভাবে কোনো প্রচার চালানো হয়নি।

রফিকুল ইসলাম নামে একজন বলেন, তিনি এই ব্যাংকিং শাখায় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে পরে জেনেছেন তাঁর বিল পরিশোধ হয়নি। পরে জরিমানাসহ একত্রে পাঁচ হাজার টাকা ফের বিল পরিশোধ করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আউটলেটের পরিচালক শেখ মাজহারুল ইসলাম মিজান হচ্ছেন শিয়ালধরা বাজারের পাশে অবস্থিত উদং গ্রামের বাসিন্দা। প্রাচীরঘেরা দোতলা বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক বন্ধ। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বক্তব্য জানতে ভেতরে ঢুকতে চাইলে তাঁর স্ত্রী রিমা আক্তার প্রথমে অস্বীকৃতি জানালেও পরে রাজি হন। পরিচালক মিজান সাংবাদিকদের জানান, আউটলেটের ব্যবস্থাপক হিসাবে যাঁকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই মাজহারুল ইসলাম সোহেল আগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, কালীগঞ্জ বাজার শাখার তদারকিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ব্যবস্থাপক কীভাবে কী কাজ করেছেন তা তিনি তখন বুঝতে পারেননি। এখন বুঝতে পারছেন তিনি (ব্যবস্থাপক সোহেল) অনেক অনিয়ম করে গেছেন। এই কারণে তিনি তাঁর (সোহেল) বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলাও করেছেন। তাঁর আউটলেটে দুই হাজার ৮০০ গ্রাহক ছিলেন, তাদের কারও টাকা লেনদেনে কোনো সমস্যা হয়নি। এখন কয়েকজন গ্রাহক তাঁর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করছেন। কিন্তু তিনি কারও টাকা আত্মসাৎ করেননি, আত্মসাৎ করলে এতদিনে কেউ হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতেন।

আউটলেটের ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম সোহেলকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি বর্তমানে সৌদি আরব বসবাস করছেন। গ্রাহকদের দাবি, আউটলেটের পরিচালক মাজহারুল ইসলাম মিজানই তাঁকে (সোহেলকে) সৌদি আরবে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার জানান, তাঁর স্বামী এজেন্ট ব্যাংকে চাকরি করতেন তা ঠিক। কিন্তু আউটলেটটি বন্ধ হওয়ার পর জীবিকার তাগিদে তিনি বিদেশে চলে গেছেন। তাঁর স্বামী দেশে থাকা অবস্থায় গ্রাহকরা টাকা আত্মসাতের কোনো অভিযোগ করতে শোনেননি তিনি।

নান্দাইলের অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির কালীগঞ্জ বাজার শাখার ব্যবস্থাপক হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, নান্দাইলের শিয়ালধরা বাজারের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি ২০২৫ সালের জুন মাসে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ওই আউটলেটের কিছু গ্রাহকের ৪০-৪৫ লাখ টাকার এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট) অগ্রণী ব্যাংকের মূল শাখায় জমা রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। তারা যে ধরনের নির্দেশনা দেবেন সেই অনুযায়ী কাজ করা হবে।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে তিনি অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে ডেকেছিলেন। কিন্তু তিনি দায়সারা গোছের উত্তর দিয়েছেন।
 

আরও পড়ুন

×