বন্যার পর ভাঙন, দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুতের ১৭ পোল অপসারণ
পানি কমলেও থামেনি দুর্ভোগ; গোয়ালঘরে জায়গা নেই। পানিতে দিন কাটছে গৃহপালিত পশুর। গত মঙ্গলবার রাজশাহীর বাঘার করারী নওশারা গ্রাম সমকাল
বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। বরং দেখা দিয়েছে ভাঙন আতঙ্ক। নতুন করে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও শত শত গাছপালা। কর্মহীন হয়ে পড়েছে চরের শ্রমজীবী মানুষ, দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। আটটি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা। ১১৫টি বিদ্যুতের খুঁটি বিলীন হওয়ায় আতঙ্কে দিন-রাত নির্ঘুম কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন ওই এলকার শত শত পরিবার।
দুর্ঘটনার এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ
নতুন করে এই ভাঙনের মুখে পড়েছে উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের করারী নওশারা গ্রাম। সেখানে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দেড়শ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, ওই এলাকা থেকে যেকোনো মুহূর্তের দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে ১৭টি পোল সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এতে প্রায় আড়াইশ পরিবারকে অন্ধকারে রাত কাটাতে হচ্ছে।
বর্তমানে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর বাঘা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মনিরুল জানান, ভাঙনের মুখে করায়ী নওশারা গ্রাম থেকে নতুন করে ১৭টি বিদ্যুতের খুঁটি নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। ভাঙন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার স্থাপন করা হবে।
সংকট এখন নদীভাঙন
কয়েক দিনের বন্যায় চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মধ্যে অন্তত ১৩টি প্লাবিত হয়েছিল। গৃহহীন মানুষজন তখন ঘরের মাচায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কেউ আবার গবাদি পশু সঙ্গে নিয়ে উঁচু জায়গার সন্ধানে ছুটছেন প্রতিদিন। এখন পানি কিছুটা নামতে শুরু করলেও নদীভাঙন চরাঞ্চলবাসীর প্রধানতম সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে চকরাজাপুর ইউনিয়নের চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, কালিদাসখালীসহ আশপাশের আরও কয়েকটি গ্রাম হারিয়ে যাবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভাঙনে চৌমাদিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ গাজীর বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে। ঘর সরিয়ে পরিবার নিয়ে তিনি এখন বাংলা বাজার এলাকায় কোনোমতে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে বছরের পর বছর গুছিয়ে নেওয়া ভিটেমাটিটা নদীতে চলে গেল, এখন কই যামু, পোলাপান নিয়ে কী খামু কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।’
চকরাজাপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীনগর গ্রামে কামরুল মোল্লার বসতভিটাসহ নদীতে তলিয়ে গেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা জিও ব্যাগও। পানি কমার পর এই বন্যায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে নিম্নবিত্ত ও দিনমজুর মানুষের ওপর। চরাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ এখন পুরোপুরি কর্মহীন। কৃষিকাজ বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার নেই বললে চলে, যার প্রভাবে অনেক পরিবারের দিন কাটছে অনাহারে- অর্ধাহারে।
চৌমাদিয়া বাজারের দিনমজুর হাশেম আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘ত্রাণ পাওয়া বা না পাওয়া বড় কথা নয়; আমরা কাজে ফিরে পরিবার নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই।’
ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জগলু শিকদার জানান, পানি কমতে শুরু করলেও চকরাজাপুরের চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমার কোনো চিহ্ন নেই। ৫ নম্বর
ওয়ার্ড সদস্য সহিদুল ইসলাম জানান, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনেকে পাশে দাঁড়ালেও এবার সরকারি সহায়তা ছাড়া তেমন কোনো সাহায্য পৌঁছায়নি। তবে সরকারি চাল ও শুকনো খাবারের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্থানীয় কিছু স্বেচ্ছাসেবকের পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে।
স্কুলগুলোতে বন্ধ পাঠদান
ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ শক্ত আঘাত হেনেছে স্থানীয় শিক্ষা কার্যক্রমে। পানি ও কাদার কারণে চরাঞ্চলের ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত আটটিতে পাঠদান পুরোদমে বন্ধ ছিল। নদীভাঙনের তীব্রতায় ইতোমধ্যে চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আতারপাড়া ও ফতেপুর পলাশী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া পশ্চিম চর কালীদাসখালী, লক্ষ্মীনগর ও চর কালীদাসখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে এখনও কাদাপানি জমে থাকায় এবং চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় সেখানে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বাঘা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামুনুর রহমান জানান, ইউনিয়নের মাত্র তিনটি বিদ্যালয়ে কোনোমতে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। পদ্মার পানি আর না বাড়লে কাদা-পানি শুকানোর পর ছাত্রছাত্রীরা আবার স্কুলে ফিরতে পারবে বলে আশা করছেন তিনি।
গো-খাদ্যের তীব্র সংকট
শুধু ঘরবাড়ি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলের মাঠ। গো-চারণভূমি সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেনখামারিরা। পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকায় এবং খড়ের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ায় পশুর ক্ষুধা মেটাতে বেগ পেতে হচ্ছে। রাজা ব্যাপারী জানান, নিজের থাকা-খাওয়ার চেয়ে এখন গরু-ছাগল রক্ষা করা আর তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহফুজা শামীমা আক্তার জানান, বন্যায় পশুর রোগবালাই বা মহামারির প্রাদুর্ভাব না ঘটে, সেজন্য মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে আছে। আশার কথা, বন্যার কারণে এখন পর্যন্ত পশুর ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েনি। তবে খামারিরা মূলত পশুর বাসস্থান ও খাদ্যের তীব্র সংকটে পড়েছেন। নদী ও মাঠের পানি কমলেও সেখানে নতুন ঘাস না গজানো পর্যন্ত গো-খাদ্যের এই সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পশুর জন্য সরকারিভাবে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া চালু রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
দুর্ভোগের কারণ অবৈধ বালু উত্তোলন
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের একটি বড় অভিযোগ, পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল কর্তৃক অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীতে এ ধরনের আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক ভাঙন দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, নদীতে অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ না করলে শুধু বাঁধ বা জিও ব্যাগ দিয়ে বাঘার চরাঞ্চল রক্ষা করা যাবে না।
নদীর এমন ভয়াল রূপ বাঘার মানচিত্রে নতুন নয়। গত কয়েক বছরে পদ্মায় চিরতরে হারিয়ে গেছে চকরাজাপুর ও লক্ষ্মীনগরের মূল গ্রাম দুটি। ২০২১ সালের ভাঙনে এই ইউনিয়নের ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বড় অংশ তলিয়ে গিয়েছিল। সে সময় চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, চেয়ারম্যানের বাসভবন ও কমিউনিটি ক্লিনিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চকরাজাপুর ইউনিয়নের প্রশাসক তরিকুল ইসলাম জানান, নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে হাজার হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। এক সময় এই ইউনিয়নে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বাস থাকলেও বর্তমানে আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী লোকসংখ্যা ১১ হাজারের বেশি নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ১১শর বেশি পরিবারকে ইতোমধ্যে সরকারি সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।