ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদিবাসী দিবস

মান্দি শিশুরা ভুলতে বসেছে মাতৃভাষা

মান্দি শিশুরা ভুলতে বসেছে মাতৃভাষা
×

ফুলবাড়িয়ায় আদিবাসী এই শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষা চর্চার একমাত্র প্রতিষ্ঠান 'আলোঘর' খোলার অপেক্ষায় প্রতিদিন আসে বিদ্যালয় মাঠে - সমকাল

কবীর উদ্দিন সরকার হারুন, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১৫:০০

আদিবাসী গারো বলে পরিচিত মান্দি জাতির মানুষ কথা বলেন আচিক ভাষায়। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার মান্দিদের মধ্যে বহুকাল থেকেই এ ভাষার চর্চা চলে আসছে। তবে প্রাত্যহিক জীবনে বাংলা ভাষার অধিক ব্যবহার এবং নিজ ভাষায় পড়ালেখার সুযোগ কম থাকায় সময়ের সঙ্গে মলিন হতে চলেছে আচিক ভাষা। এই জাতিগোষ্ঠীর অনেক শিশু এখন নিজেদের পরিবারে ও বাইরে বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে ভাষাটির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা জেগেছে।

উপজেলার নাওগাঁও ইউনিয়নের হায়দ্রাবাদ গ্রামের দিনমজুর তুহিন চাম্বুগংয়ের ১০ বছরের মেয়ে নিদ্রা চাম্বুগং। হায়দ্রাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী সে। মা-বাবার কাছে টুকটাক দু-একটি আচিক শব্দ শিখলেও আদতে হাতে-কলমে কোনো শিক্ষাই নিতে পারেনি নিদ্রা। এর প্রধান কারণগুলোর একটি পরিবারের অপর সদস্যদের মধ্যে কথা বলায় বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ। সাধারণ বাঙালিদের সঙ্গেই সারাদিনের চলাফেরা থাকায় আচিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়েছে। এখানকার শিশুরা গ্রামের যে স্কুলে পড়াশোনা করে, সেখানে তাদের অধিকাংশ সহপাঠীই বাঙালি। মান্দি শিশুরা এসব স্কুলে বাংলা মাধ্যমেই পড়াশোনা করে। এসব কারণে নতুন প্রজন্মের মান্দিরা নিজেদের আচিক ভাষা এক রকম ভুলে যেতে বসেছে।

নিদ্রার মতো অধিকাংশ মান্দি শিশু-কিশোর নিজেদের ভাষার বই কিংবা অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত নয়। মান্দি পরিবারগুলোর অভিভাবকদের শঙ্কা- এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে এ গ্রাম থেকে আচিক ভাষা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে এটি আঘাত করবে মান্দিদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে।

জানা যায়, নাওগাঁও ও পাশের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ পরিবারে অন্তত দুই হাজার মান্দির বাস। গত চার বছরে একটি এনজিওর অর্থায়নে চলা মান্দিদের মাতৃভাষা শিক্ষার একমাত্র স্কুলটিও বন্ধ। এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলসহ জনপ্রতিনিধিদেরও কোনো মাথাব্যথা নেই। স্কুলটি চালুর ব্যাপারে কেউ এগিয়ে আসেনি।

সরেজমিন নাওগাঁও ইউনিয়নের হায়দ্রাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের দরগাচালা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এনায়েতপুর ইউনিয়নের দোলমা আলোঘর ঘুরে এগুলোর বেহাল দশাই দেখা গেছে। রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের হাতিলেইট গ্রামের অন্তত ২০ জন মান্দি শিশু-কিশোরের সঙ্গে কথা হলে জানা যায়, তারা আচিক ভাষা জানে না। গ্রামটিতে অল্প কিছু সচেতন পরিবারের সন্তানদের আচিক ভাষায় কথা বলতে শিখিয়েছে। তবে কেউই লিখতে বা পড়তে জানে না।

এ বিষয়ে কথা হয় হাতিলেইট দরগাচালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিল্পী মারাকের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়টি মিশনের আওতায় পরিচালিত হয়। সরকার আদিবাসীদের জন্য মাতৃভাষা শিক্ষার বই দিলেও সরকারি কারিকুলাম অনুযায়ী পড়ানো খুব কঠিন। আচিক ভাষায় পড়াতে যে পারিশ্রমিক প্রয়োজন, সেটিও তারা পান না। করোনার কারণে স্কুলগুলোও বন্ধ। অনেক আবেদন করেও শিশুদের জন্য স্কুল ফিডিং এবং উপবৃত্তির টাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়নি। এসব কারণে দরিদ্র আদিবাসী শিশুরা বাংলা মাধ্যমের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।

হায়দ্রাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মন্দিরা চাম্বুগং জানান, এই স্কুলটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কারিতাসের অর্থায়নে পরিচালিত হতো। এটি ৬-৭ বছর চললেও ফান্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় চার বছর ধরে বন্ধ। আদিবাসী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারীকরণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার। এ ভাষাকে ধরে রাখতে আমাদের এলাকার স্কুলগুলোতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। না হলে স্কুলগুলোকে টিকিয়ে রাখা যাবে না।

একই অবস্থা দোলমা গ্রামের আচিক ভাষার শিক্ষাকেন্দ্র আলোঘরের। এটিও পরিচালিত হতো কারিতাসের অর্থায়নে। এই স্কুলটিও চার বছর ধরে বন্ধ। দোলমা গ্রামের পঞ্চায়েতপ্রধান জগদীশ মারাক বলেন, মাতৃভাষা শিক্ষার জন্য আমাদের কাছে কোনো বই না থাকায় ভাষাটির অক্ষর কেমন, সেটিও আমরা জানি না। গ্রামের কোনো শিশু এখন আর তার মাতৃভাষায় কথা বলে না।

ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন-ফুলবাড়িয়া শাখার সভাপতি লুইস সুপ্রভাত জেংচাম বলেন, শুধু পারিবারিক শিক্ষাই যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও জরুরি। তাই আচিক ভাষা রক্ষায় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

আরও পড়ুন

×