ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি

.

জান্নাতুল মাওয়া

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৪ | ২৩:০৮

গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১-এর মতে, বাংলাদেশ দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন উভয়ের জন্যই বিশ্বের সপ্তম চরম দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকির ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায় দেশের উপকূলের ১৯টি জেলায়। উপকূলীয় অঞ্চলে গত দুই দশকে বেড়েছে ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, জলোচ্ছ্বাস, খরা, বেঁড়িবাধ ভাঙন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, পানি সংকট। এসব আপদ ও দুর্যোগ সরাসরি প্রভাব ফেলেছে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ওপর। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত করেছে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে। এসব আপদ ও দুর্যোগকে সামাজিক, স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষতির মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়। শুধু লবণাক্ততা নিয়ে যদি উপকূলের মানুষের জীবনের গল্প বিশ্লেষণ করি, দেখা যাবে লবণাক্ততার কারণে তীব্র পানি সংকটে মানুষ। মিষ্টি পানির উৎস এখন নোনাপানির দখলে লবণাক্ত পানি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে। পানির নিচের লেয়ারে এখন আর মিঠাপানি পাওয়া যায় না। ফলে একজন নারীকে এক কলস সুপেয় পানি নিতে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। ফলে একটি বা দুটি পানির উৎসে ভিড় লেগে থাকে। অনেক সময় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় এক কলস পানির জন্য। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মনে করে, হয়তো গল্প বা অন্য কোনো কারণে তার বেশি সময় লেগেছে। ফলে নারীর ওপর চলে শারীরিক ও মৌখিক নির্যাতন। কখনও কখনও কিছু নারী ওই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এবং সময় বাঁচাতে রাতে ও ভোরে পানি সংগ্রহে যেতে চায়। নির্জন রাস্তা থাকার কারণে তারা শারীরিক ও মানসিক হেনস্তার শিকার হয়। কিশোরীরা হয় যৌন নিপীড়নের শিকার। বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও দলিত নারীদের জন্য এ পানি সংগ্রহ আরও কঠিন। ফলে প্রতি পদে তারা সামাজিক ও মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে চলে। 

মমতা দাসের জন্ম সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভাড়াশিমলা গ্রামের নারায়ণপুরের ঋষিপাড়ায়। কিশোরী মমতা বলে, ‘আমরা পানি আনতে যাই ওয়াপদার ফিল্টারে। আমাদের পাড়া তো খালপাড়ে, তাই এখানে নলকূপের পানি নোনা। মিষ্টিপানি ওঠে না। আমাদের সবাইকে যেতে হয় ওয়াপদায়। ওখানে ছাড়া আর তো পানির জায়গা নেই। পানি আনতে গেলে অনেক সমস্যা। প্রথমে যারা পানি বিক্রি করে তারা লাইন ধরে পানি নেবে। তারপর অন্য গ্রামের মানুষ। আর আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমরা ঋষি বলে আমাদের কলসি কখনও আগে দেবে না। আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। সবার পরে আমাদের দেওয়া হবে। বিকেলে গেলে অধিকাংশ সময় আমাদের সন্ধ্যা হয়ে যায়। আমাদের লোকজন ভালো না। আমরা কয়েকটা মেয়ে আছি, তাদের দেখলে বাজে বাজে কথা বলে। এরপর কিছু ছেলে আমাকে প্রায়ই বিরক্ত করত। বাড়িতে এসে বললেও কোনো লাভ হতো না, বরং বাড়ির লোকজন প্রতিবাদ করতে ভয় পেত যদি পরে বড় কোনো ঝামেলা হয়। অভাব, উত্ত্যক্ত করা– এ সবকিছু মিলিয়ে আমার স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হলো।’

আরেক কিশোরী ফতেমাতুজ জোহরা বলে, “অনেক দূরে ফিল্টারে পানি আনতে যেতে হয়। পানি আনতে রাস্তাঘাটে বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছেলেরা আড্ডা দেয়। একা গেলে তো ভয়ে জান বের হয়ে যায়। আবার যখন সবার সঙ্গে যাই তখনও এমন নোংরা কথা বলে ইঙ্গিত দেয়, তা বলার মতো না। পানির কষ্ট বলে বহু মানুষ পানি নিতে আসে। ভিড়ও হয় খুব। তাই গেলেই পানি নিয়ে আসা যায় না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বাড়িতে পানি নিয়ে আসতে দেরি হলে সৎমা মারধর করে এবং বলে– ‘ছেলেদের সঙ্গে টাংকি মারিস।’ প্রায়ই বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এখানে তো আমার কোনো দোষ না। পানি না থাকলে তো ফিল্টারে কেউ পানি দেবে না। এমনিতে যখন বৃষ্টি কম হয় তখন আরও খারাপ অবস্থা থাকে। কেউ কাউকে সামান্য সহযোগিতা করতে চায় না। সবার একটাই উদ্দেশ্য, নিজের বাড়ির জন্য পানি ঠিকমতো পেল কিনা।”
লবণাক্ততা ঘিরে উপকূলের নারীরা ভোগে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। যেখানে খাবার পানির এত সংকট, সেখানে গোসল, শৌচকাজে বিশুদ্ধ পানি স্বপ্নের মতো। ফলে গোসল, শৌচ ও গৃহস্থালির কাজ করে নোনা ও অস্বাস্থ্যকর পানি দিয়ে। 

আরেকজন নারী হচ্ছেন সুফিয়া খাতুন। যিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরাসরি ভুক্তভোগী। তিনি বলেন, ‘নোনাপানিতে আট ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করার কারণে আমার জরায়ুতে সমস্যা হয় এবং আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখনও ওষুধ খাচ্ছি। ওষুধের যে ব্যয় তা বহন করা আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন।’
উপকূলীয় অঞ্চলে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার কৈখালী গ্রামে জন্ম রুমা মুন্ডার। দীর্ঘ সময় ধরে নোনাপানিতে কাজ করার ফলে তাঁর জরায়ুতে ইনফেকশন হয়েছে, যা তাঁর কর্মজীবনের জন্য অনেকটা ঝুঁকি। এ বিষয়ে তিনি ভালো পরামর্শ চেয়েছেন, যাতে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সচ্ছলতা এনে পরিবারকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারেন।

শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের সালমা বলেন, ‘নোনাপানিতে থাকলে মেয়েদের অনেক সমস্যা হয়। এখানে মেয়েরা মাসিক হলে আগের মতো কাপড় ব্যবহার করতে পারে না। কারণ কাপড় ধোয়ার সমস্যা। নোনাপানিতে কাপড় ধুলে আরও সমস্যা হয়। গোপন জায়গায় অনেক রোগ বাসা বাঁধে। তাই একটু সচ্ছল মেয়েরা এখন প্যাড ব্যবহার করে। কিন্তু গরিবরা তা পারে না।’
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-আইসিসিসিডির প্রকল্প কর্মকর্তা নাজনীন নাহার তাঁর গবেষণায় বলেন, ‘বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ৯৪ শতাংশ নারী যৌন সমস্যায় ভুগছে। এ সংখ্যা অ-উপকূলীয় গ্রামগুলোর তুলনায় পাঁচ গুণ। উপকূলীয় অঞ্চলে পানির ব্যবহার যৌন রোগের ব্যাপকতার বড় কারণ।’ গ্রামের নারীদের আয়ের উৎস হলো হাঁস-মুরগি পালন, কৃষিকাজ। দলিত নারী সতী বলেন, ‘বুলবুল ও আম্ফানে দু’বারই ঘর ভেঙেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি ও মাটির লবণাক্ততা খুব বেশি বেড়ে যাওয়ায় এখন আর বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করা যায় না। হাঁস-মুরগি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।’ অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের জন্য সহযোগিতা অপ্রতুল। v 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, বিন্দু নারী উন্নয়ন সংগঠন
 

আরও পড়ুন

×