ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুষ্প

স্নিগ্ধ সুন্দর পিস লিলি

স্নিগ্ধ সুন্দর পিস লিলি
×

ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জয়নুল উদ্যানে পিস লিলি। ছবি: লেখক

চয়ন বিকাশ ভদ্র

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:১৭

ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্রের তীরে জয়নুল আবেদিন পার্ক। প্রতিদিন সকালে প্রাতর্ভ্রমণকারীদের পদচারণায় মুখর থাকে এই উদ্যান। সম্প্রতি এক সকালে গিয়েছিলাম সেখানে। উদ্যানের মূল গেট দিয়ে প্রবেশের পর একটু সামনে বাঁ দিকে লোহার রেলিং দেওয়া বাগান। সেখানে দেখা মিলল পিস লিলির।

পিস লিলির আরেক নাম স্নো ফ্লাওয়ার। আধুনিক অন্দরসজ্জায় অন্যতম জনপ্রিয় এবং নান্দনিক এই  বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Spathiphyllum floribundum. এটি Araceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতির পরম মমতায় গড়া এই উদ্ভিদটি তার মার্জিত রূপ, সহজ পরিচর্যা এবং চমৎকার বায়ো-ফিল্টারিং গুণাবলির জন্য বিশ্বজুড়ে বৃক্ষপ্রেমীর হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে।  

যুদ্ধে আত্মসমর্পণের প্রতীক কিংবা শান্তির বার্তা হিসেবে ব্যবহৃত সাদা পতাকার সঙ্গে পিস লিলির মোড়ানো সাদা পাতার অদ্ভুত দৃশ্যমান মিল রয়েছে। এই সাদা পতাকাসদৃশ পুষ্পমঞ্জরির কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শান্তির লিলি’ বা ‘পিস লিলি’। এ ছাড়া এর তুষারশুভ্র দর্শনের জন্য একে ‘স্নো ফ্লাওয়ার’ও বলা হয়।  

পিস লিলির প্রাকৃতিক বাসস্থান মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু ক্রান্তীয় এলাকা। বনাঞ্চলের বড় বড় গাছের ছায়ায়, স্যাঁতসেঁতে মাটিতে এরা প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রতিকূল এবং কম আলোর পরিবেশেও মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতার কারণে এটি গৃহসজ্জার জন্য আদর্শ উদ্ভিদে পরিণত হয়েছে। 
 পিস লিলির পাতাগুলো বেশ চওড়া, দীর্ঘ এবং উজ্জ্বল গাঢ় সবুজ রঙের হয়। পাতার উপরিভাগ মসৃণ ও চকচকে। প্রতিটি পাতা কন্দাকার গোড়া থেকে লম্বা বোঁটার সাহায্যে সরাসরি ওপরের দিকে বিস্তার লাভ করে। গাঢ় সবুজ পাতার এই চিরহরিৎ প্রাচুর্য ঘরের ভেতর প্রকৃতির সজীব ছোঁয়া নিয়ে আসে।

 পিস লিলির ফুল আসলে কোনো একক পাপড়ি নয়। কেন্দ্রীয়ভাবে অবস্থিত দণ্ডাকার পুষ্পমঞ্জরিটিকে ঘিরে একটি দুধ-সাদা রঙের বিশেষ পাতা থাকে। দেখলে মনে হয় কোনো লাজ-নম্র ঘোমটা পরা বধূ শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। দুধ-সাদা ফুলের সঙ্গে গাঢ় সবুজ পাতার বৈপরীত্য অনিন্দ্য সুন্দর এক স্নিগ্ধতা তৈরি করে। প্রজাতিভেদে টবে রোপণকৃত পিস লিলি সাধারণত এক থেকে তিন ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। এর আকৃতি বেশ সুগঠিত ও ঝোপালো প্রকৃতির।

পিস লিলি কেবল চোখের প্রশান্তি জোগায় না, বরং এর ব্যবহারিক ও পরিবেশগত গুরুত্বও অপরিসীম। নাসার ক্লিন এয়ার গবেষণা অনুযায়ী, পিস লিলি ঘরের ভেতরের বাতাস থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন যেমন– বেনজিন, ফরমালডিহাইড, ট্রাইক্লোরোইথিলিন এবং অ্যামোনিয়া দূর করতে অত্যন্ত কার্যকরী।

 গৃহ, অফিস কিংবা প্রকাশ্য পার্কের অন্দরসজ্জায় এর ব্যবহার নান্দনিক মাত্রা যোগ করে। গাঢ় সবুজের সঙ্গে দুধ-সাদা ফুলের সৌন্দর্য মানুষের মনে মানসিক প্রশান্তি এনে দেয় এবং চাপ কমাতে সাহায্য করে।

সরাসরি তীব্র সূর্যালোকের প্রয়োজন হয় না। ঘরের অপ্রত্যক্ষ হালকা আলোতেই এটি চমৎকারভাবে বেড়ে ওঠে। মাটি শুকিয়ে এলে সামান্য জল সেচনই এর জন্য যথেষ্ট। তাছাড়া এটি বাতাসের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

পিস লিলির স্নিগ্ধ উপস্থিতি হৃদয়ে এক টুকরো অমলিন শান্তি পৌঁছে দেয়। পিস লিলি শুধু একটি হাউস প্লান্ট নয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বায়ু পরিশোধক গুণাবলি এবং স্নিগ্ধতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন এ ফুল।

লেখক: উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক 

আরও পড়ুন

×