ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব

সেরা সিনেমা ‘লা বোলা নেগ্রা’, ইতিহাস গড়ল ‘অ্যাং’

সেরা সিনেমা ‘লা বোলা নেগ্রা’, ইতিহাস গড়ল ‘অ্যাং’
×

ছবি-সংগৃহীত

অনিন্দ্য মামুন, টরন্টো (কানাডা) থেকে

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:১৯

১১ দিনের চলচ্চিত্রযাত্রার পর পর্দা নামল কানাডার মর্যাদাপূর্ণ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (টিআইএফএফ) ৫১তম আসরের। শেষ দিনে উৎসবজুড়ে দর্শক ও জুরিদের পছন্দে উঠে এসেছে একের পর এক চলচ্চিত্র। এ বছরের সর্বোচ্চ দর্শকভোটের স্বীকৃতি পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে জাভিয়ের কালভো ও জাভিয়ের আমব্রোসি পরিচালিত স্প্যানিশ চলচ্চিত্র ‘লা বোলা নেগ্রা’। আর আন্তর্জাতিক বিভাগে পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড গেছে সাইমন স্টোনের ‘এলসিনোর’-এর ঝুলিতে।

টিআইএফএফ লাইটবক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এবারের পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে এবারের উৎসবে ১২টি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল পিপলস চয়েসের চার বিভাগ, প্ল্যাটফর্ম প্রাইজ, কানাডিয়ান চলচ্চিত্রের দুটি পুরস্কার, শর্ট কাটস, ফিপ্রেসি ও নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড।

উৎসবের সবচেয়ে আলোচিত পুরস্কারগুলোর একটি পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড। ১৯৭৮ সালে চালু হওয়া এ পুরস্কারটি টিআইএফএফের দর্শকদের ভোটে নির্বাচিত হয়। এবার মূল বিভাগে ‘লা বোলা নেগ্রা’র পর প্রথম রানারআপ হয়েছে পিটার ফ্যারেলির ‘আই প্লে রকি’, দ্বিতীয় রানারআপ সিয়ান হেডারের ‘বিইং হিউম্যান’।

আন্তর্জাতিক বিভাগে ‘এলসিনোর’-এর পর প্রথম রানারআপ হয়েছে লি চ্যাং-ডংয়ের ‘পসিবল লাভ’ এবং দ্বিতীয় রানারআপ হুর জিন-হোর ‘দ্য অ্যাসাসিন(স)’।

তথ্যচিত্র বিভাগেও দর্শকের পছন্দ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যারি অ্যাভরিচ পরিচালিত ‘ডার্লিন লাভ: আই নো হোয়্যার আই’ভ বিন’ পেয়েছে পিপলস চয়েস ডকুমেন্টারি অ্যাওয়ার্ড। এ বিভাগে প্রথম রানারআপ ‘ব্ল্যাক সানফ্লাওয়ার্স’, দ্বিতীয় রানারআপ ‘দ্য আল্ট্রা রানার’।

আর টিআইএফএফের আলোচিত মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে দর্শকের পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে ম্যাথিউ র‌্যাঙ্কিন পরিচালিত ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, ব্রায়ান মুলরোনি’। এ বিভাগে প্রথম রানারআপ ‘দ্য স্পাইরাল’, দ্বিতীয় রানারআপ ‘অ্যারেস্টেড মেমোরি’।

তবে এবারের আসরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে প্ল্যাটফর্ম প্রাইজে। ২০১৫ সালে চালু হওয়া এ পুরস্কার দেওয়া হয় শক্তিশালী নির্মাণদৃষ্টি ও স্বতন্ত্র গল্প বলার জন্য। এবার পুরস্কারটি পেয়েছে ভারতের নির্মাতা থেজা রিওর ‘অ্যাং’। পাঁচ সদস্যের আন্তর্জাতিক জুরি নির্বাচিত এ চলচ্চিত্রের নির্মাতা পেয়েছেন ২০ হাজার কানাডিয়ান ডলার পুরস্কার।

প্ল্যাটফর্ম জুরি তাদের বক্তব্যে ছবিটির সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি, শক্তিশালী নির্মাণ এবং একটি বিশ্বের গভীর অনুরণিত চিত্র তুলে ধরার প্রশংসা করেছে। তাদের ভাষায়, নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি, সাহসিকতা ও নির্ভীকতা ছবিটিকে আলাদা করে তুলেছে।

প্ল্যাটফর্ম বিভাগে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছে আমান্ডা কার্নেলের ‘ব্রেস ইওর হার্ট (গ্যারাট ডু ভাইমু)’। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও বুলগেরিয়ার যৌথ প্রযোজনার এ চলচ্চিত্রটি তার আপাত সরলতার আড়ালে আজকের বিশ্বের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরেছে বলে মনে করেছে জুরি।

এবারের প্ল্যাটফর্ম প্রাইজের গুরুত্ব আরও বেড়েছে একটি নতুন নিয়মের কারণে। টিআইএফএফের প্ল্যাটফর্ম প্রাইজ জয়ী কোনো অ-ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র এখন সরাসরি অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে যোগ্যতার পথ পাবে। বিশ্বের মাত্র ছয়টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কারের এমন সরাসরি পথ রয়েছে।

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিভাগ শর্ট কাটসেও ছিল বৈচিত্র্যের ছাপ। সেরা আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে গ্রিস ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ প্রযোজনার ‘মাম্মালিয়া’, পরিচালক এলিয়া কালোজিয়ানি। সেরা কানাডিয়ান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হয়েছে মাইকেল ডেল মন্টের ‘ফাইট কিড’। আর সেরা অ্যানিমেটেড স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার গেছে যুক্তরাজ্যের বরুণ রমন ও টম হ্যানককের ‘ইনটু দ্য বেটাভার্স’-এর হাতে।

শর্ট কাটস বিভাগে সম্মানজনক উল্লেখ পেয়েছে যথাক্রমে ‘দ্য স্পেকটাকুলার ডেথ অব প্রিসকা’, ‘অলমোস্ট পিংক’ এবং ‘টার্মিনাল’।

এদিকে উদীয়মান নির্মাতাদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য দেওয়া ফিপ্রেসি প্রাইজ পেয়েছে আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযোজনা ‘অ্যানসেস্টরস’। ডেভিড টারপিন পরিচালিত ছবিটি হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পরস্পরকে খুঁজে পাওয়ার গল্পে স্মৃতি, ভালোবাসা, অস্থিরতা ও আশার এক আবেগঘন জগৎ তৈরি করেছে বলে মনে করেছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের সংগঠন ফিপ্রেসির জুরি।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি দেওয়া নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে ফিলিস্তিনের নির্মাতা হোসাম আবু দানের ‘থার্টিন ইন গাজা’। চলমান যুদ্ধ ও গণহত্যার বাস্তবতায় মানুষের দুর্ভোগকে নিছক প্রদর্শনীতে পরিণত না করে জীবনের জটিলতাকে অন্তরঙ্গভাবে তুলে ধরার জন্য ছবিটিকে পুরস্কৃত করেছে জুরি।

কানাডার নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্যও এবারের উৎসব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে কোডি লাইটনিং পরিচালিত ‘স্মাজ দ্য ব্লেডস’। পুরস্কার হিসেবে নির্মাতা পেয়েছেন ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলার।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, ঔপনিবেশিকতার অভিঘাত, পরিবার, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সম্প্রদায়ের শক্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটির প্রশংসা করেছে জুরি। তাদের মতে, আনন্দ ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিকে ভিত্তি করে নির্মিত এ চলচ্চিত্র পরিচিত ঘরানাকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে আদিবাসী মানুষের কণ্ঠ।

এ বিভাগে সম্মানজনক উল্লেখ পেয়েছে ইউলা বেনিভলস্কির ‘দ্য ব্ল্যাক বক্স ইজ অরেঞ্জ’। ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আর্কাইভাল ছবির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি ইতিহাস মুছে ফেলার প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পর্ক তুলে ধরেছে ছবিটি।

আর বেস্ট কানাডিয়ান ফিচার ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে সার্ভিল পব্লেতের ‘সানবার্ন’। প্রাণবন্ত, হাস্যরসাত্মক ও মানবিক এ ছবির নির্মাণশৈলী, অভিনয় এবং টরন্টোকে নতুন এক শক্তিতে তুলে ধরার প্রশংসা করেছে জুরি। পুরস্কার হিসেবে নির্মাতা পেয়েছেন ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলার।

এ বিভাগে সম্মানজনক উল্লেখ পেয়েছে অ্যাড্রিয়ান বুইটেনহুইসের ‘ম্যান ইন মোশন: দ্য রিক হ্যানসেন স্টোরি’। রিক হ্যানসেনের অসাধারণ যাত্রাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার পাশাপাশি আড়ালে থাকা মানুষদের কথাও মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য ছবিটির প্রশংসা করেছে জুরি।

এবারের টিআইএফএফে ১১ দিনে ৭২টি দেশের ২৯৪টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। ৯৮টি রেড কার্পেটে অংশ নিয়েছেন আট শতাধিক তারকা ও চলচ্চিত্রকর্মী। উৎসবে উপস্থিত ছিলেন প্রায় দুই হাজার স্বীকৃত গণমাধ্যমকর্মী, টিআইএফএফ: দ্য মার্কেটের প্রায় সাত হাজার প্রতিনিধি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ২৭৯ জন পরিচালক।

চলচ্চিত্রের এই বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে আজ পর্দা নামল টিআইএফএফের ৫১তম আসরের। আগামী বছর ৯ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে উৎসবটির ৫২তম আসর।

আরও পড়ুন

×