দ্রুত বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষণাসহ ৭ দাবি সাদপন্থিদের
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুরুল ইসলাম হলে ‘ওলামা হযরত ও তাবলীগের সাধারণ মুসল্লিদের’ ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শফিক বিন নাঈম। ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:২৭
গাজীপুরের টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে মাওলানা সাদ অনুসারীদের জন্য ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণা করাসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে সাদপন্থিরা। একই সঙ্গে ইজতেমা ময়দান সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে উভয় পক্ষকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুরুল ইসলাম হলে ‘ওলামা হযরত ও তাবলীগের সাধারণ মুসল্লিদের’ ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। তাবলীগের সাথীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শফিক বিন নাঈম।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের মালিকানা সরকারের। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বিশ্ব ইজতেমা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ১৬০ একর জমি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিলেন। ফলে কোনো পক্ষের এককভাবে ময়দান ব্যবহারের অধিকার নেই বলে দাবি করেন তারা।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্ব মারকাজ নিজামুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা হয়ে আসছে। আগামী বিশ্ব ইজতেমাও টঙ্গী ময়দানেই আয়োজনের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দুই পক্ষের ইজতেমায় বিদেশি মেহমানদের অংশগ্রহণের তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। সাদপন্থিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জুবায়েরপন্থিদের ইজতেমায় ৬ হাজার ৮৩২ এবং সাদপন্থিদের ইজতেমায় ৯ হাজার ১১০ বিদেশি মেহমান অংশ নেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ২৫৬ ও ৯ হাজার ২৩১। দুই বছরে মোট বিদেশি মেহমানের ৬৭ শতাংশ সাদপন্থিদের ইজতেমায় অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
২০১৮ ও ২০২৪ সালের ঘটনা নিয়ে অভিযোগ
২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বরের সংঘর্ষের বিষয়ে সাদপন্থিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের পাঁচ দিনের জোড় কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এনে পাহারায় রাখা হয়েছিল। ওই হামলায় তাদের দুই সাথী ইসমাইল মন্ডল ও শামসুদ্দিন বেলাল মারা যান বলেও দাবি করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ওই ঘটনায় করা মামলায় সিআইডি তদন্ত শেষে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। পরে পিবিআই পুনঃতদন্ত করেও ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। এরপরও জুবায়েরপন্থিরা তাদের ‘খুনি’ হিসেবে প্রচার করছে বলে অভিযোগ করা হয়।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাদপন্থিদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যাচার’ করা হচ্ছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। তাদের বক্তব্য, ১৪ ডিসেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ১৫ ডিসেম্বর ইজতেমা ময়দান ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে জুবায়েরপন্থিদের লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল। পরে মাঠ না ছাড়ায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনায় তাদের সাথী বেলাল হোসেন নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে চলমান তদন্তে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার না করার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, তদন্তকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
সাদকে এনে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চায়
মাওলানা সাদকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে এনে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
তাদের দাবি, বিভাজনের আগে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাওলানা সাদ টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমার প্রধান বক্তা ছিলেন এবং আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করতেন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি তাবলীগের কাজে সফর করছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া কাকরাইল মসজিদ নিয়েও নিজেদের অধিকার দাবি করেছে সাদপন্থিরা। তাদের অভিযোগ, কাকরাইল মসজিদ ‘তাবলীগ জামাত বাংলাদেশ’-এর নামে স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও জুবায়েরপন্থিরা সেটি দখল করে রেখেছে।
সাত দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সাদপন্থিদের উত্থাপিত দাবিগুলো হলো—
১. টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে মাওলানা সাদ অনুসারীদের আগামী বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণা করা।
২. টঙ্গী ইজতেমা ময়দান সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে উভয় পক্ষকে ইজতেমা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ দেওয়া এবং সমতা নিশ্চিত করা।
৩. কাকরাইল মসজিদ ‘তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ’-এর কাছে বুঝিয়ে দেওয়া।
৪. দেশের সব মসজিদে বাধাহীনভাবে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারি আদেশ জারি করা।
৫. অপপ্রচার ও মিথ্যাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. জুবায়েরপন্থি পাঁচ ব্যক্তির আয়-ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ ও মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে কথিত অপকর্মের তদন্ত করা।
৭. মাওলানা সাদ সম্পর্কে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী বক্তব্যের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার সুযোগ দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা নুরুল ইসলাম, মুফতি ফয়জুর রহমান, মুফতি বোরহান, ড. মো. রেজাউল করিম, তৌহিদুল হক সোহেল, মোহাম্মদ সায়েম, অধ্যাপক মনজুরুল হক, তারেক মাহমুদ, অধ্যাপক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া, অধ্যাপক আব্দুল হান্নান ও সাঈদ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।