ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনিরাপদ চারপাশ, সহজ শিকার শিশুরা

অনিরাপদ চারপাশ, সহজ শিকার শিশুরা
×

কোলাজ

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৮

মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবার নিয়ে সবচেয়ে নিরাপদ যে ঘর, সেই ঘরেও এখন নিরাপদ নয় শিশু। আবার যে বাড়ি বা পাড়া-মহল্লায় স্বচ্ছন্দের শৈশব কাটানোর কথা, সেই জায়গায়ও নির্মমতার শিকার হচ্ছে কোমল প্রাণ। এতে ঘরে ও বাইরে– দুই স্থানেই সে অনিরাপদ।

চারপাশ অনিরাপদ হওয়ার পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, কিশোর গ্যাং, মাদক, আইনি দুর্বলতা, পারিবারিক অসচেতনতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা। কুমিল্লায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে শিশুর বেড়ে ওঠার সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। 

শিশু অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৩তম। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিডস রাইটস ফাউন্ডেশন সর্বশেষ ২০২৫ সালে এই তালিকা প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেখা যায়, সর্বশেষ প্রতিবেদনে ভারতের অবস্থান ভারত ৯৬, পাকিস্তান ১৫৫, গ্রিস প্রথম এবং আফগানিস্তান সর্বনিম্ন স্তরে (১৯৪তম)। শিশুদের জীবনের অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, নিরাপত্তা এবং অধিকার ভোগ করার পরিবেশ– এই পাঁচটি বিষয়ে ২৩টি সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে। একে বলা হচ্ছে ‘কিডস রাইটস ইনডেক্স’। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুসমর্থন করা দেশকে এখানে বেছে নেওয়া হয়েছ। 

কিডস রাইটস ফাউন্ডেশন একটি সামাজিক ও একাডেমিক যৌথ উদ্যোগ। নেদারল্যান্ডসের এরাসমাস ইউনিভার্সিটি রোটেরডাম এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজ যৌথভাবে ২০১০ সালে এ উদ্যোগ শুরু করে। 

২০১৩ সালে তারা প্রথম শিশু অধিকার সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোর বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় করে। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি-আগস্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ঘটনায় ২৫৪ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ হিসাবে মাসে ৩১ জনের বেশি শিশুর লাশ পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় ৮১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৮ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যার শিকার ৪৯ জন। এই আট মাসে নিখোঁজের পর লাশ পাওয়া গেছে ৩৬ শিশুর। নিহত ২৫৪ শিশুর প্রায় ৪৩ শতাংশের ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী। শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশু রয়েছে ৭৪ জন। এটি মোট নিহতের প্রায় ২৯ শতাংশ। কিশোর-কিশোরীদের পাশাপাশি ছোট শিশুরাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ৭ থেকে ১২ বছরের ৬০ জন সহিংসতার শিকার হয়েছে। আসক বলছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের সূত্র থেকে শিশুর লাশ উদ্ধারের এই তথ্য পেয়েছে তারা। 

আসকের নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকারকর্মী তাহমিনা রহমান সমকালকে বলেন, শিশুদের বেড়ে ওঠার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেখানে ব্যর্থ হওয়া যাবে না। নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুর লাশ পাওয়া যাবে– এটা দেখতে চাই না। যত দ্রুত সম্ভব জীবিত উদ্ধার করতে হবে। 

তিনি বলেন, সন্তানকে সুরক্ষিত রাখা এখন পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে– এদিকে নজর রাখা জরুরি। তথ্যের অধিকার থেকে যেমন শিশু-কিশোরদের বঞ্চিত করা যাবে না, আবার ইন্টারনেটে সে কী করছে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

শিশুর লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি অনেক শিশু নিখোঁজ থাকছে। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, পরিবারের সদস্যরা জানেন না। সন্তানের অপেক্ষায় অনেকে বছরের পর বছর পার করছেন। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান এখনও মেলেনি। এ হিসাবে নিখোঁজ শিশুদের ১৩ শতাংশের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের বিষয়ে ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জনকে উদ্ধার করা যায়নি। একই সময়ে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং এক হাজার ৯৭০ জন উদ্ধার হয়নি।

পুলিশের ভাষ্য, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে ঘুরতে গিয়ে পথ ভুলে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় এবং একাকী বাসায় ফিরতে গিয়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ হয়।

অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, অনৈতিক কাজে জড়িয়ে লজ্জার ভয়ে পালিয়ে থাকা, স্বাধীন জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়ের কৌশল, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবের মতো কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বর্তমানে সেবা সহজীকরণের অংশ হিসেবে অনলাইন জিডি সুবিধা চালু রয়েছে পুলিশ। এতে নিখোঁজের বিষয়ে জিডির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে নিখোঁজের বিষয়ে ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০।

পুলিশ সদরদপ্তরের পৃথক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। আগস্ট মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে দুই হাজার ১৫৬টি, জুলাইয়ে দুই হাজার ৩৩৬, জুনে দুই হাজার ২০০, মে মাসে এক হাজার ৯৫২, এপ্রিলে দুই হাজার ১১, মার্চে এক হাজার ৪৮৫, ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ১৮১ ও জানুয়ারিতে এক হাজার ২৮১টি। 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছরের তিন শিশুকে হত্যা করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর পাবনায় চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া এক মেয়ে শিশু নিখোঁজ হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর বাড়ির পাশের ডোবা থেকে তার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দুজন হলেন প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিক (৫৫) ও তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলী (২১)। এই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার প্রধান আসামির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। 

৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার একটি বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রী ও নবজাতকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিন বোনের মধ্যে সিপার বয়স ১০ এবং ইকরা ১৭ বছর ও সাইমা আক্তারের বয়স ছিল ২১ বছর। আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে খুন করা হয় ১২ বছরের ছেলে আয়ুশকে। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর লাশ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তাঁর এক বছরের সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবিকতা বা মানবতাবোধ উন্নত হচ্ছে না। শিশুরা দুর্বল বলে স্বার্থ আদায়ের জন্য তাদের নির্যাতন এবং হত্যা করা হচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। শিশু কেবল বাইরের পরিবেশেই অনিরাপদ নয়, পরিচিত জায়গায় এমনকি অনেক সময় নিকটাত্মীয় তাদের বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের মাধ্যমে হত্যার ঘটনাও ঘটছে।

এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সঠিক সুরক্ষার অভাব শিশুদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বাবা-মায়ের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় ভার্চুয়াল জগতেও শিশুরা প্রতিনিয়ত অনিরাপদ হয়ে উঠছে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়তে হলে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সম্মিলিত সচেতনতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শিশুবান্ধব হতে হবে। শিশুবান্ধব হতে হবে সমাজ এবং সমাজের মানুষকে। এটি না হলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।

আরও পড়ুন

×