প্রকৃতি
অতীতের আবহাওয়ার তথ্য মিলবে শামুকের খোলসে
বিজ্ঞানীদের মতে, শামুকের খোলস বিশ্লেষণ করেও প্রাগৈতিহাসিক কালের আবহাওয়ার মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। ছবি: সায়েন্স অ্যালার্ট
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০৪ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০৫
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতার এই যুগে অতীত, এমনকি প্রাগৈতিহাসিক যুগের আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের তথ্য উদ্ঘাটনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উপায় খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। তাদের উদ্ভাবন অনুযায়ী, আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো অতি সাধারণ স্থলজ শামুকের খোলস বিশ্লেষণ করে প্রাগৈতিহাসিক কালের ঘূর্ণিঝড় এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়ার মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য হলোসিসে সম্প্রতি গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
শামুকের খোলসের গঠন ও বিকাশের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত ওই গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা জানান, ডিম থেকে ফোটার সময় থেকেই কোমল অঙ্গগুলোকে সুরক্ষা দিতে শামুকের পিঠে খোলস থাকে। শক্ত এই আবরণ পরে প্রাণীটির শারীরিক বৃদ্ধিকেও প্রভাবিত করে। গঠনগত কারণে শামুক তার খোলসটিকে ভেতর থেকে চওড়া বা বড় করতে পারে না। ফলে এটি খোলসের মুখের বাইরের দিকে বড় হয়। শরীর যখন খোলস থেকে বাইরের দিকে প্রসারিত হয়, তখন শামুকের পিঠে থাকা ‘ম্যান্টল’ নামক একটি বিশেষ অঙ্গ খোলসের মুখে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণ করতে থাকে। বাতাসের সংস্পর্শে আসলে এই রস শক্ত ক্রিস্টালে পরিণত হয়। আর এভাবেই শামুকের বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খোলসটিও বাইরের দিকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বড় হতে থাকে।
এই গঠন প্রক্রিয়াকে অনেকটা গাছের বৃদ্ধির বলয় বা গ্রোথ রিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। শামুক তার খোলসের মুখে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের যে নতুন বলয় যুক্ত করে, সেটি তার জীবনের নানা পরিবেশগত তথ্য চমৎকারভাবে রেকর্ড করে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, গবেষণায় ব্যবহৃত একটি শামুকের খোলসের কিছু বলয়ে উচ্চ মাত্রার রেডিওকার্বনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি মূলত ষাটের দশকে অস্ট্রেলিয়ায় চালানো পারমাণবিক পরীক্ষার প্রত্যক্ষ চিহ্ন।
গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী ভূতত্ত্ববিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী নিকোলাস প্যাটন বলেন, খোলসের এই বলয়গুলোর সুনির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করতে আমরা উচ্চমাত্রার রেডিওকার্বন ডেটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি। অস্ট্রেলিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষাগার থেকে নির্গত রেডিওকার্বন বিশ্লেষণ থেকেই আমরা জানতে পেরেছি, গবেষণাধীন শামুকটি প্রায় সাড়ে চার বছর বেঁচে ছিল।
তিনি বলেন, খোলসের উপাদানে কার্বন ও অক্সিজেনের আইসোটোপ আটকে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই আইসোটোপ বিশ্লেষণ করেই শামুকের জীবিত থাকার সময়কার জলবায়ু, পারিপার্শ্বিক পরিবেশগত পরিবর্তন এবং তাদের খাবারের উৎসের সূত্র বের করতে পারেন।
বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, শামুকের খোলসের বৃদ্ধি সারা জীবন ধরে সমহারে ঘটে না। কোনো কোনো বছর তাদের পরীক্ষাধীন একটি শামুকের খোলসের বৃদ্ধির হার ছিল অত্যন্ত সামান্য বা প্রায় শূন্য। আবার কোনো বছরে এই শামুকটির খোলস বেড়েছিল ১৪৪ মিলিমিটার পর্যন্ত। গবেষণা দলের সদস্য পরিবেশ বিজ্ঞানী জেমি শুলমিস্টার বলেন, আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শামুকটি নির্দিষ্ট কিছু চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনায় অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল।
যেহেতু শামুকের খোলস খনিজ প্রকৃতির, তাই শামুকটির মৃত্যুর পরও খোলসগুলো পরিবেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় অবিকৃতভাবে টিকে থাকে। আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে তথ্য সংরক্ষণের যুগ শুরু হওয়ার আগে পৃথিবীতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা বের করতে এ ধরনের জৈবিক প্রমাণ ব্যবহারের বিজ্ঞান ক্রমশ উন্নত হচ্ছে।
- বিষয় :
- জলবায়ু পরিবর্তন
- প্রকৃতি