ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন মাসে বাড়তি ব্যয় হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা

তিন মাসে বাড়তি ব্যয় হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০৭ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২২

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে চলতি বছরে সরকারের বাড়তি প্রয়োজন হবে ৩৭ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ আগামী তিন মাসের মধ্যে সরকারকে এই অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। 

নতুন বেতন কাঠামো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়ে বকেয়া পরিশোধ করা হবে। তবে এখনই সরকারি কর্মচারীরা পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাবেন না। দুই অর্থবছরে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর হবে। 

নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। আর ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাবেন ৫০ শতাংশ। এরপর আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত বেতনের ৭০ শতাংশ পাবেন। আর ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ হারে পাবেন। আগামী বছরের ১ জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির শতভাগ কার্যকর হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় বাড়তি মূল বেতন, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্টে সরকারের ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা বাড়বে। চলতি অর্থবছরে দ্বিতীয় দফায় মূল বেতন ও পেনশনের কারণে খরচ আরও বাড়বে।

গত শনিবার নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। নতুন কাঠামোয় সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন বেতন দাঁড়াবে ভাতাসহ ৩৩ হাজার টাকার কিছু বেশি। গাড়ি সুবিধা ছাড়া সর্বোচ্চ বেতন হবে ভাতাসহ প্রায় আড়াই লাখ টাকা। মূল বেতন তিন ধাপে দেওয়া হবে। আর বাড়ি ভাড়াসহ সব ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বছর অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।  ২০২৭ সালে ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি এবং ২০২৮ সালে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।  

বেতন-ভাতার জন্য বাড়তি বরাদ্দ জনপ্রশাসন খাতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেওয়া হয়। বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে বাড়তি ৫৫ হাজার কোটি টাকা রাখেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে তখনও নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা কোডে এ বাড়তি বরাদ্দ দেখানো হয়নি।

প্রতিবছরের বাজেটের ‘সংক্ষিপ্তসার বিবরণী-২খ’ নামে একটি অংশ থাকে, যা এবারও রয়েছে। এতে ‘পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ তুলে ধরা হয়। এ বিশ্লেষণে অফিসারদের বেতন, কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা— এই তিন ভাগে বরাদ্দের হিসাব দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরের জন্য তিন ভাগে এ হিসাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা ছিল মোট ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। সে হিসাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয় চার হাজার ১৮৫ কোটি টাকা।

সম্পদের ব্যবহার অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ বাবদ চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এখানে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই টাকা থেকে চলতি অর্থবছরে সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনধারীদের নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় হবে। সংশোধিত বাজেটে এ অর্থ সংশ্লিষ্ট কোডে সমন্বয় করা হবে।

অর্থের সংস্থানে উপায় খুঁজবে এনবিআর

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল ঘোষণার কারণে সরকারের যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, ওই অর্থের জোগানের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের উপায় খুঁজতে বলা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ নির্দেশনা দেন। 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা।

কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি অর্জন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজস্ব আদায়ে কখনোই ২৭ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধির রেকর্ড নেই। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, নতুন পে স্কেলের জন্য বাড়তি যে টাকা প্রয়োজন হবে, তা এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমেই মেটাতে হবে।

প্রয়োজন হলে ঋণ

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান করতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণও নেওয়া হবে। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ কথা জানিয়েছেন।

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান কোথা থেকে হবে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণও নেওয়া হবে। ঋণ নেওয়াকে তিনি কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না।

বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী আবার বিয়ে না করলে আজীবন পেনশন পাবেন

মৃত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী আবার বিয়ে না করলে আজীবন পারিবারিক পেনশন পাবেন। তবে এ সুবিধা অব্যাহত রাখতে প্রতিবছর একবার পুনর্বিবাহ না করার অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে দাখিল করতে হবে। ৫০ বছরের বেশি বয়সী বিধবার ক্ষেত্রে অবশ্য এ অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গতকাল এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, নিট পেনশন, আনুতোষিক, পারিবারিক পেনশন ও ছুটি নগদায়নের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে, যেগুলো গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও অবসরকালীন সুবিধায় নতুন হিসাব নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন নিয়মে চাকরিকালের ভিত্তিতে পেনশনের হার হবে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ। বিদ্যমান পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে নিট পেনশন সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পাঁচ বছর থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তার বেশি সময় পর্যন্ত ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করে পেনশনের হার নির্ধারণ করা হবে।

পাঁচ বছর চাকরি হলে পেনশনের হার হবে মূল বেতনের ২১ শতাংশ। এরপর প্রতিবছর চাকরিকালের সঙ্গে পেনশনের হার বাড়বে। ১০ বছর চাকরিতে হার ৩৬ শতাংশ, ১৫ বছরে ৫৪ শতাংশ এবং ২০ বছরে ৭২ শতাংশ।

আরও পড়ুন

×