মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্তের দাবি বায়রা সদস্যদের
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত ও সঠিক তথ্য উপস্থাপনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৩১ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৪৭
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর স্বার্থ বিবেচনা না করে দেশ ও কর্মীদের কর্মসংস্থানের স্বার্থে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যরা। তারা বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে দেশে-বিদেশে নানামুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সময়মতো শ্রমিক পাঠাতে না পারলে মালয়েশিয়া সরকার অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি থেকে শ্রমিক নিয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করবে। ফলে বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত, সঠিক তথ্য উপস্থাপন ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বায়রা সদস্যদের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বায়রার সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক পাঠানোর নানা উদ্যোগের ফলে মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কর্মীদের কোনো অভিযোগ নেই। তারপরও যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক তালিকাভুক্ত হয়নি, তারা মিটিং-মিছিল, সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও বিধিবিধান অনুসরণ করার পরও প্রতিদ্বন্দ্বী রিক্রুটিং এজেন্সি মানবপাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের মতো মামলা-মোকদ্দমা করে শ্রমবাজার উন্মুক্তের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২২-২৪ মেয়াদে তালিকাবহির্ভূত কিছু এজেন্সি, যাদের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমোদন ছিল না, তারা ডামি ডিমান্ড লেটারের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত এজেন্সির নামে ব্যবসা করেছে। এসব এজেন্সি অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগীর সঙ্গে মিলে অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়ে পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এতে দেশের টিআইপি র্যাংকিংসহ জনশক্তি রপ্তানি খাতের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
লিখিত বক্তব্যে আরও জানানো হয়, মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে অধিকসংখ্যক কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি তাদের সবার ন্যূনতম মূল বেতন ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত নির্ধারণ করেছে। এতে একজন কর্মী মূল বেতন-ভাতা ও ওভারটাইমসহ মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে দ্বিগুণেরও বেশি। এ কারণে বাংলাদেশের সাধারণ কর্মীরা মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য বেশি আগ্রহী।
মালয়েশিয়া সরকারের ইকোনমিক প্ল্যানিং ইউনিট নির্ধারিত ২৫ লাখ বিদেশি কর্মীর সিলিং অতিক্রম করায় দেশটির সরকার ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশসহ সব সোর্স কান্ট্রি থেকে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে মালয়েশিয়া সরকার সোর্স কান্ট্রিগুলো থেকে পুনরায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেয়।
বক্তব্যে বলা হয়, মালয়েশিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে সোর্স কান্ট্রিগুলো এবং বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও মিয়ানমার উল্লেখযোগ্য হারে কর্মী পাঠানো শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশ এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেনি। একই সময়ে বাংলাদেশ কর্মী পাঠানো শুরু করতে পারলে এতদিনে অন্তত এক লাখ কর্মীর অভিবাসন সম্পন্ন হতো বলে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে গত বছরের ২৭ অক্টোবর মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণকারী বাংলাদেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা পাঠানোর অনুরোধ করে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি তালিকা পাঠায়।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার বিন ইব্রাহিমের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পর উভয় সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে দ্রুত কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দেন। এরপর মালয়েশিয়া সরকার ক্রাইটেরিয়া পূরণ করা ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্য থেকে বোয়েসেলসহ ২৬টি মূল এজেন্সি এবং সহযোগী ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট করে। মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যে এসব এজেন্সির মধ্যে কোটা বরাদ্দ শুরু করেছে। বরাদ্দ করা কোটার কর্মীদের জন্য অনলাইনে ই-এম্বাসি সফটওয়্যার মডিউলে কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের অ্যাটেস্টেশনসহ পরবর্তী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, দুই দেশের সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ও ফলপ্রসূ আলোচনার পর যখনই কর্মী নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে বায়রার কিছু সদস্য এজেন্সি ও মধ্যস্বত্বভোগী, যারা ইতিপূর্বে নামে-বেনামে ব্যবসা করেও অভিবাসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে, তারা গণমাধ্যম ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন এবং আন্দোলন, মিটিং-মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারটিকে আবারও বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে আল আকাবা অ্যাসোসিয়েটের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান বিশ্বাস, পূর্বী ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মহিউদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।