ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পিসিওএস প্রতিরোধে সহজলভ্য ও সমন্বিত চিকিৎসা জরুরি

পিসিওএস প্রতিরোধে সহজলভ্য ও সমন্বিত চিকিৎসা জরুরি
×

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনে সমকাল কার্যালয়ে গতকাল সোমবার ‘পিসিওএস (পিএমওএস) জানুন, সচেতন হোন এবং প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা- সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) শুধু সন্তান ধারণের সমস্যা নয়; বয়ঃসন্ধিকাল থেকে নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। পিসিওএস সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে কিশোরী থেকে শুরু করে প্রজননক্ষম নারী—সব পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রোগটিকে শুধু গাইনি সমস্যা হিসেবে না দেখে হরমোন, বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। 

সোমবার রাজধানীতে সমকাল সভাকক্ষে ‘পিসিওএস (পিএমওএস): জানুন, সচেতন হোন এবং প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব কথা বলেন। সেপ্টেম্বর পিসিওএস সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষে প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া ও সমকাল যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। এতে বৈজ্ঞানিক সহযোগী ছিল রেনাটা পিএলসি। 

পিসিওএস শুধু প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, পিসিওএসকে শুধু ডিম্বাশয়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ রোগের সঙ্গে হরমোন ও বিপাকীয় পরিবর্তন জড়িত।

ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম বলেন, পিসিওএসকে শুধু ডিম্বাশয়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ রোগের সঙ্গে হরমোন ও বিপাকীয় পরিবর্তন জড়িত। অনেক কিশোরী আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়ে ওভারিতে পরিবর্তন দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসকের কাছে আসে। গ্রামাঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রে পিসিওএসকে টিউমার মনে করা হয় এবং অপ্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের প্রবণতা দেখা যায়। পিসিওএস থাকলেই সন্তান হবে না—এমন ধারণাও ভুল। এ রোগে ডিম্বাণুর পরিপক্বতা ও ডিম্বস্ফোটনে সমস্যা হতে পারে, তবে যথাযথ চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সন্তান ধারণ সম্ভব।

তিনি আরও জানান, গ্রামাঞ্চলেও পিসিওএসের সমস্যা উল্লেখযোগ্য। অনেক কিশোরী ও তরুণীর মুখে অবাঞ্ছিত লোম, ব্রণ ও ত্বকের দাগ দেখা যায়। এসব নিয়ে অনেকেই সামাজিক ও মানসিকভাবে বিব্রত থাকেন। অনেক সময় স্কুলে সহপাঠীদের উপহাসের শিকার হতে হয়। তাই এসব রোগীর সঠিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন। পিসিওএসের চিকিৎসায় ভুল কোনো পদ্ধতি বেছে না নিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সায়েবা আখতার বলেন, পিসিওএস এখন একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের মতো পিসিওএসের জন্যও একটি জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা উচিত। 

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বন্ধ্যত্ব ও আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন আব্বাসী। তিনি বলেন, পিসিওএসের কারণ, লক্ষণ, মাসিকের সমস্যা, বন্ধ্যত্ব, ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

সিকদার মেডিকেল কলেজের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. এস কে জিন্নাত আরা নাসরীন বলেন, ভ্রূণ তৈরির সময় থেকে বংশপরম্পরায় পিসিওএসের প্রবণতা আসতে পারে। এটি নারীর আজীবনের এক সঙ্গী বা দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, তবে সঠিক নির্দেশনায় একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিন
ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় পিসিওএসের প্রকোপ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এবং কিশোরীদের মধ্যে এর হার ৬ থেকে ৮ শতাংশ। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকলে অবহেলা করা ঠিক নয়। প্রজননক্ষম বয়সে দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকার ফলে জরায়ুর অভ্যন্তরীণ আস্তরণে ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বয়স বাড়ার সঙ্গে ডায়াবেটিসের ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। 

ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. কোহিনুর বেগম বলেন, প্রজননক্ষম বয়সে দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকলে মেটাবলিক প্রভাবের কারণে এন্ডোমেট্রিয়াল কার্সিনোমা বা ক্যান্সার হতে পারে। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকে অনিয়মিত মাসিককে গর্ভাবস্থা মনে করে ভুল করেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

শুধু আলট্রাসনোগ্রামেই রোগ নির্ণয় নয়
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, অনেক কিশোরী আলট্রাসনোগ্রাম করিয়ে ওভারিতে পরিবর্তন দেখে আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। অনেক ক্ষেত্রে পিসিওএসকে টিউমার মনে করা হয় এবং অপ্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের প্রবণতা দেখা যায়। 

বারডেম হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক  ফারিয়া আফসানা বলেন, কেবল আলট্রাসনোগ্রামে পলিসিস্টিক ওভারি দেখে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়, কারণ প্রকৃত সিস্ট এবং অপরিণত ফলিকলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক ডা. মির্জা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, কিশোরীদের আলট্রাসনোগ্রামে ওভারিতে একাধিক ফলিকল দেখা গেলে পিসিওএস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। 

পিসিওএস মানেই বন্ধ্যত্ব নয়
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মুসাররাত সুলতানা বলেন, প্রায় ৬০ শতাংশ নারী জানতে পারেন না, তাদের পিসিওএস আছে এবং স্বাভাবিকভাবে তাদের সন্তান হয়। যাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ যেমন– অতিরিক্ত ব্রণ, অবাঞ্ছিত লোম, চুল পড়া বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি পায়, তারাই কেবল চিকিৎসকের কাছে ছোটেন। 

অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সঙ্গে একমত পোষণ করে ডা. মির্জা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, অনেকের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে কিছু রোগীর মাসিক অনিয়ম, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বেশি থাকায় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এনাম ফার্টিলিটি সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. এফ. এম. এনামুল হক বলেন, পিসিওএস মানেই বন্ধ্যত্ব নয়। এটি নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। 

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নয়
ডা. এফ. এম. এনামুল হক চিকিৎসায় সতর্কতার কথা উল্লেখ করে বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে ওভুলেশন ইনডিউসিং ওষুধ বা ইনজেকশন নেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ‘ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম’-এর মতো গুরুতর জটিলতা হতে পারে। 

লেজার চেইন স্কিন সেন্টারের কনসালট্যান্ট চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম খান বলেন, অনেকে শুধু অবাঞ্ছিত লোম বা ব্রণের চিকিৎসা চান। মূল হরমোনজনিত কারণ শনাক্ত না করে শুধু লেজার বা ওষুধ ব্যবহার করলে স্থায়ী সমাধান হবে না। আগে গাইনি বা এন্ডোক্রাইন বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে মূল চিকিৎসা করাতে হবে।

খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান গোলাম আযম বলেন, জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে শুরুতে ওজন নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা গেলে অনেক ক্ষেত্রে পিসিওএস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ডা. ফারিয়া আফসানা বলেন, ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত জীবনযাত্রায় পরিবর্তন– সুষম খাবার ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ১২ বছরের আগে এসব ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। 

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের পুষ্টিবিদ চন্দন কুণ্ডু বলেন, পিসিওএস চিকিৎসায় ডায়েট ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন ৫০ ভাগ ভূমিকা রাখে। শিশুদের প্রসেসড ফুড ও চিপসের মতো খাবারের বদলে স্কুলের টিফিনের জন্য ফল, বাদাম ও ওটস দেওয়া যেতে পারে। সাদা ভাতের বদলে লাল চালের ভাত এবং ময়দার বদলে লাল আটার রুটি খাওয়া উপকারী। 

মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, অনেক কিশোরী ও তরুণীর মুখে অবাঞ্ছিত লোম, ব্রণ ও ত্বকে দাগ দেখা যায়। এসব নিয়ে অনেকে সামাজিক ও মানসিকভাবে বিব্রত থাকেন। অনেক সময় স্কুলে সহপাঠীদের উপহাসের শিকার হতে হয়। তাই এসব রোগীর সঠিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন। 

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা আলগিন বলেন, সমাজে প্রচলিত বন্ধ্যা শব্দটি অত্যন্ত নেতিবাচক। বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তা পিসিওএস রোগীদের মধ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলে। এমনকি কিছু গবেষণায় আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যায়। তাই শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দিতে হবে।

সচেতনতার তাগিদ
পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট-এর চেয়ারম্যান সাবিনা স্যাবি বলেন, পিসিওএস নিয়ে এখনও ব্যাপক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামে স্কুল পর্যায় থেকে কিশোরী স্বাস্থ্য ও পিরিয়ড সচেতনতা বাড়াতে হবে। 

রেনাটা পিএলসির ডিজিএম (মার্কেটিং) খায়রুল ইসলাম বলেন, পিসিওএস নিয়ে এখনও তথ্য ও সচেতনতার ঘাটতি আছে। বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির জন্য কিশোরী ও নারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে রেনাটা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সমকালের সহকারী সম্পাদক হাসান জাকির।

আরও পড়ুন

×