ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাছের সর্ববৃহৎ প্রজনন ক্ষেত্র বিনাশের আশঙ্কা

মাছের সর্ববৃহৎ প্রজনন ক্ষেত্র বিনাশের আশঙ্কা
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বীপ জেলা ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। সমীক্ষা শেষে অর্থায়নকারী দেশ খোঁজা হচ্ছে। এটি পদ্মা সেতুর চেয়েও দীর্ঘ হবে। এ সেতুর মাধ্যমে পাইপলাইনে ভোলার গ্যাস বরিশালে সরবরাহ করা হবে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন, বহুমুখী বিনিয়োগ ও আধুনিক যোগাযোগের নতুন দিগন্তের সম্ভাবনা দেখছে সরকার।  

সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় ক্ষতির আশঙ্কাও আছে। ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ হলে এই এলাকায় ইলিশের দুটি অভয়াশ্রম ধ্বংস হতে পারে। সাগর থেকে মেঘনায় ইলিশ চলাচলের পথ এসব নদী। মৎস্য অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদী দেশে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সবচেয়ে বড় প্রজনন ক্ষেত্র। সেতু নির্মাণের বিরূপ প্রভাবে এ দুটিসহ আশপাশের নদীতে চর সৃষ্টি ও নাব্য সংকটে প্রজনন ক্ষেত্র হারানোর আশঙ্কা আছে। 

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক কামরুল হাসান জানান, দেশের ৭০ ভাগ ইলিশ আহরণ হয় দক্ষিণাঞ্চলের নদনদীতে। এই ৭০ ভাগের ৩০ ভাগই পাওয়া যায় ভোলা জেলায়।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) সূত্রে জানা গেছে, ভোলা-বরিশাল সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন প্রণীত হয়েছে ২০২৩ সালে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের ৭ম প্ল্যাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। গত ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় নীতিগতভাবে এটি অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আরএডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেতসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত অষ্টম বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের সভায় ভোলা-বরিশাল ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে গৃহীত হয়।  

প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতুর (সংযোগ সড়ক বাদে) দৈর্ঘ্য হবে ১০ দশমিক ৮৬৭ কিলোমিটার। সেতুর এক প্রান্ত হবে কালাবদরের তীরে বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাটে; অপর প্রান্ত তেঁতুলিয়া নদীর তীরে ভোলার ভেদুরিয়ায়। দুটি স্থানেই বর্তমানে ফেরিঘাট রয়েছে। 

মৎস্য খাত নিয়ে বড় আশঙ্কা 
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশের জন্য অভ্যন্তরীণ নদীর ৬টি পয়েন্টে মোট ৪৩২ কিলোমিটার অভয়াশ্রম রয়েছে। বরিশালের কালাবদর ষষ্ঠ অভয়াশ্রমভুক্ত এবং ভোলার তেঁতুলিয়া চতুর্থ অভয়াশ্রমভুক্ত নদী। এ ছাড়া তেঁতুলিয়ার মোহনা দিয়ে ইলিশ কালাবদর নদী হয়ে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনা পর্যন্ত আসা-যাওয়া করে। ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠা নিরাপদ করতে বছরের একাধিক সময় অভয়াশ্রমে আহরণে বিভিন্ন মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা থাকে। এর সুফল হিসেবে গত কয়েক বছরে এ দুটি নদী পাঙ্গাশ, আইড়, পোমাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে বলে জানান মৎস্য কর্মকর্তারা। এর আগে পায়রা বন্দর ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীতে মাছের ৪০ কিলোমিটারের অভয়াশ্রম স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেছে। 

যেখানে হবে সেতু 
সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ৩টি স্থান নিয়ে যাচাই-বাছাই করে বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাট থেকে ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে এবং ভেদুরিয়া ফেরিঘাটের সামান্য ভাটিতে সেতু নির্মাণে সর্বাধিক উপযুক্ত স্থান বিবেচিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এতে ৩টি প্রধান নদী খাত, একাধিক ছোট খাল ও অভ্যন্তরে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চরাভূমি রয়েছে। পানির গভীরতা স্থানভেদে ৬ থেকে ২১ দশমিক ৯ মিটার পর্যন্ত। তেঁতুলিয়া নদীতে ৩ থেকে ৪ মিটার জোয়ার-ভাটার ওঠানামা রয়েছে। বর্ষাকালে এর আয়তনিক প্রবাহের হার প্রায় ২৮ হাজার ৮৭০ ঘনমিটার/সেকেন্ডে পৌঁছায়। গত কয়েক বছরে প্রস্তাবিত সেতু স্থানের আশপাশে তেঁতুলিয়া নদীর গতিপথে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। প্রবাহের পরিমাণ অনুসারে নদীর অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তীর কাছাকাছি হওয়ায় সুরক্ষামূলক কাজ করা যাবে। 

সমীক্ষা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেতু নির্মাণের প্রস্তাবিত নদী এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম। সেখানে ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী রয়েছে। এসব সুরক্ষার বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘নকশায় ব্যবহৃত উন্নত মাটি স্থিতিশীলকারী রাসায়নিকযুক্ত পাইলগুলো ন্যূনতম শব্দ ও কম্পন তৈরি করবে, যা ডলফিন, ইলিশ মাছসহ জলজ প্রাণীদের জন্য ন্যূনতম ব্যাঘাত ঘটাবে। সেতুটি কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদী প্রণালির সরকারিভাবে ঘোষিত ইলিশ অভয়াশ্রমের মধ্যে অবস্থিত। তবে নদীতে ন্যূনতম সংখ্যক স্তম্ভ থাকার কারণে বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব কম হবে। নির্মাণকালে ইলিশ ও ডলফিনের ওপর প্রভাব কমানোর নির্দেশিকা চুক্তিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যা ইলিশ ও ডলফিনের ওপর প্রভাব হ্রাস করবে।’

দুটি নদীর গতিপথ
বরিশাল সদর উপজেলার হবিনগর থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে কালাবদর মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার বামনারচর এলাকায় গজারিয়া নদীতে মিলেছে। এরপর গজারিয়া নদীর মাধ্যমে এর পানি মেঘনা নদীতে প্রবাহিত হয়। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর লঞ্চঘাট এলাকায় কালাবদর যুক্ত হয়েছে তেঁতুলিয়ার সঙ্গে।

ভোলার ইলিশা এলাকার মেঘনা নদী থেকে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়া পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার রণগোপালদি নামক স্থানে বুড়াগৌরাঙ্গ নামে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। ভোলার শাহবাজপুর থেকে মেঘনা নদীর একটি শাখাও এ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তেঁতুলিয়ার আরেকটি শাখা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে পটুয়াখালীর আগুনমুখা ও রামনাবাদ নদীতে মিলিত হয়ে সাগরে পড়েছে।

ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেন, তেঁতুলিয়ার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এর পূর্ব তীরে ভোলা ও পশ্চিমে পটুয়াখালী জেলা। মেঘনার ইলিশ সাগরে যাওয়া-আসায় তেঁতুলিয়ার পথ ব্যবহার করে। এ ছাড়া মেঘনায় প্রজনন হওয়ার পর জাটকার বড় অংশ ২ থেকে ৩ মাস তেঁতুলিয়ায় অবস্থান করে। কোনো কারণে এ নদী ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাগর দিয়ে ইলিশ তেঁতুলিয়ায় আর ঢুকবে না। 

ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হয়েছে ৪ বছর আগে। এর মধ্যে সেতুর পূর্ব ও পশ্চিমে ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চর পড়েছে। প্রকৃতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে সেতু নির্মাণের ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। ১০০ বছর পর দেখা যাবে নদীই থাকবে না। এমদাদুল্লাহর আশঙ্কা, বরিশাল-ভোলা সেতুর কারণে বাকেরগঞ্জের কারখানা এবং মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া ও মাসকাটা নদী নিশ্চিত হারিয়ে যাবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক কামরুল হাসান সমকালকে জানান, অভয়াশ্রমভুক্ত নদীতে সেতু নির্মাণ বিষয়ে এ পর্যন্ত সেতু কর্তৃপক্ষ ও মৎস্য অধিদপ্তরের মধ্যে সভা হয়নি। তবে প্রক্রিয়া চূড়ান্তর আগে এ বিষয়ে তাদের মতামত নেওয়া হবে। 

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন 
মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল ওহাব। বলেন, কালাবদর-তেঁতুলিয়া প্রাকৃতিক মাছের রেণুর জন্য দেশের সবচেয়ে বড় ‘নার্সিং হোম’। এটা রক্ষা করতে না পারলে মৎস্যসম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কারিগরি অনুবিভাগের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, সেতু হলে নদীর ভৌগোলিক পরিবর্তন হবে ও চর জাগবেই। প্রাকৃতিক এ বৈরিতা শতভাগ রোধ করা সম্ভব হয় না।

এসব বিষয়ে জানতে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ ও সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী আবু হুমায়ন মো. শাখাওয়াত আকতারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা এবং বার্তা দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। 

আরও পড়ুন

×