ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বর্ষার আগে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা প্রস্তুতির সময় এখনই

বর্ষার আগে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা প্রস্তুতির সময় এখনই
×

বৈশাখের শেষ সময়ে সোমবার দুপুরে আধাঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবল রাজধানীর বেশ কিছু এলাকা। এতে পথচারী ও কর্মজীবীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মিরপুরের কালশী এলাকা থেকে তোলা -সমকাল

 অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ০৯:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষাকাল শুরু হতে এখনও এক মাসের বেশি বাকি। গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকায় ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এতে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই প্রস্তুতি না নিলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা সামাল দেওয়া মুশকিল হবে। 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ক্যাচপিট (সড়কের পাশে বৃষ্টির পানি নালায় ঢোকার পথ), ড্রেন, খাল, বক্স কালভার্টগুলো এখনও ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। নগরীর জলাধারগুলো ক্রমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণের সক্ষমতা কমছে। রাজধানীর পানি বাইরে অপসারণের মতো পর্যাপ্ত পাম্পিং স্টেশনও নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোরও কয়েকটি বিকল।
সরেজমিন দেখা গেছে, মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগের পীরেরবাগ খাল, কল্যাণপুর খালের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। 

গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে যে বৃষ্টি হয়, তাতে মিরপুরের কালশী, নর্থ সাউথ রোড, নিউমার্কেট, আজিমপুর, বনশ্রী, বনানী, মিরপুর ১০, আফতাব নগর, সচিবালয়ের সামনে, কারওয়ান বাজারসহ পুরান ঢাকার অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। 

জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ক্যাচপিটের ছিদ্রগুলো আবর্জনা ও কাদামাটিতে বন্ধ হয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা জানান, এসবের দিকে দুই সিটি করপোরেশনের জোরালো নজর নেই। বক্স কালভার্ট, ড্রেন ও খালগুলোও ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। এ ছাড়া রাজধানীর অনেক খালই বেদখল। যেগুলো আছে, সেগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যসহ ময়লা-আবর্জনায় ভরা; পরিষ্কার করা হয়নি। 

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দা আব্দুল খালেক সমকালকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে ঢাকার অনেক জায়গায় বড় বড় নালা নির্মাণ করা হয়েছে। বড় বড় পাইপলাইন বসানো হয়েছে। কিন্তু নির্মাণকালে এগুলোর ভেতর মাটি ও আবর্জনা ঢুকে যায়। অথচ নির্মাণ শেষে এগুলো পরিষ্কার না করেই চালু করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে রাস্তার আবর্জনা গিয়ে এসব নালা বন্ধের উপক্রম হয়। কোনো সময় পরিষ্কার করতেও দেখা যায়নি। ফলে বৃষ্টির সময় পানি নামছে না। এমনকি পুরান ঢাকার অনেক জায়গায় শীতকালেও নালা উপচে সড়কে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।  কেউ এগুলোর দায়িত্ব নিচ্ছে না। জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানও হচ্ছে না। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা শহরের আয়তন অনুসারে এখানে অন্তত ২০টি পাম্পিং স্টেশন দরকার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় আছে মাত্র ৩টি। এগুলো হলো কমলাপুর, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল পাম্পিং স্টেশন। এর মধ্যে হাতিরঝিলের পাম্পিং স্টেশন অকেজো। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় আছে তিনটি পাম্পিং স্টেশন। সেগুলো হলো রামপুরা, গোড়ান চটবাড়ি ও কল্যাণপুর পাম্পিং স্টেশন। এর মধ্যে গোড়ান চটবাড়ি পাম্পিং স্টেশন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এছাড়া দুর্যোগকালে উত্তরা ও মিরপুর বেড়িবাঁধে স্বল্প পরিসরে দুটি ছোট পাম্পিং স্টেশন পরিচালনা করে ডিএনসিসি। যে পরিমাণ পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, সেটিও রাজধানীতে নেই। 

ঢাকা ওয়াসার সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এবং ড্রেনেজ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী একেএম সহিদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে আগে ঢাকায় শত শত কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি এক দিনের ভারী বৃষ্টিতেই অনেক জায়গায় পানি জমে গিয়েছিল। শুষ্ক মৌসুমে এক দিনের বৃষ্টিতে যদি পানি জমে যায়, তাহলে কয়েক দিন টানা বর্ষণ হলে কী অবস্থা হবে সেটি সহজেই অনুমান করা যায়। 

একেএম সহিদ উদ্দিন বলেন, ঢাকাকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে হলে পানি নিষ্কাশন সিস্টেমকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। এর জন্য প্রধানত দরকার আন্তরিকতা। সেটির বড় ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, খাল খননের কাজ শীতকালে করা উচিত। পাশাপাশি বক্স কালভার্ট, ড্রেন ও ক্যাচপিট পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সচল ও কার্যকর রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রেও ঘাটতি আছে। 

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন সমকালকে বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার সমাধান করতে হলে ক্যাচপিট, ড্রেন, খাল, পাম্পিং স্টেশন ও নদনদী পরিষ্কার এবং ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ডিএসসিসি এলাকায় যে সংখ্যক পাম্পিং স্টেশন রয়েছে, সেটি চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এ জন্য পাম্পিং স্টেশনের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। অন্ততপক্ষে ১০টি করা দরকার। তাহলে খুব দ্রুততম সময়ে পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে।

কাজী বোরহান উদ্দিন বলেন, ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ঢাকার পানি নিষ্কাশনের সমাধান করতে কার্যকর তেমন কোনো কাজ হয়নি। সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব আসার পর কিছুটা কাজ শুরুর পরিকল্পনা করলেও এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন সরকার উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করছে। সেসব বাস্তবায়ন হলে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।

তিনি জানান, হাতিরঝিল পয়েন্টে পাম্পিং স্টেশনে পাম্প নেই। বক্স কালভার্ট দিয়ে পানি ধীরে ধীরে যায়। সেখানে পাম্প বসালে ধানমন্ডি, গ্রিন রোডসহ আশপাশের এলাকার পানি দ্রুত সরে যাবে।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছু পয়েন্টে নগরবাসী জলাবদ্ধতায় নাকাল হন। এর মধ্যে রয়েছে ডিএনসিসিভুক্ত হওয়া নতুন এলাকা বাড্ডা, ভাটারা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, হরিরামপুরসহ পুরো এলাকা। এছাড়া মিরপুর ১০, ১১, ১২, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও তালতলা, বছিলা রোড, বনানী, উত্তরা ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেক্টরের একাংশ।

জলাবদ্ধতার ৩৩টির জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে ডিএসসিসি। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। এগুলো হচ্ছে ধানমন্ডি ২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট এলাকা, ঢাকা কলেজের পাশের নায়েম গলি, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকাররম ভবনের সামনে, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোড, সিদ্দিক বাজার, আগাসাদেক রোড, মাজেদ সরদার রোড, সাতরওজা মাজার এলাকা, মকিম বাজার, মানিকনগর টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, গুদারাঘাট নৌকাপাড়ের সামনে, মুগদা মেডিকেলের সামনে, গোপীবাগ বড় মসজিদের সামনে, কমলাপুর রেলস্টেশনের বিপরীতে, মতিঝিল শাপলা চত্বর, নটর ডেম কলেজের সামনে, শাহজাহানপুর মোড়, সবুজকানন গলি, মালিবাগ প্রথম লেন থেকে শান্তিবাগ ১৭ নম্বর গলি, পল্টন, দৈনিক বাংলা-ফকিরাপুল, মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড, ঘোষপট্টি, আগাসাদেক রোড, সাজেদা ফাউন্ডেশন-সংলগ্ন এলাকা, অভয় দাস লেন, কালেক্টর গলি, ১২ নম্বর গলি, পশ্চিম জুরাইন, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে করাতিটোলা ও জিয়া সরণি।

ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম সমকালকে বলেন, আগামী বর্ষা মৌসুমে ডিএনসিসি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রশাসকের নির্দেশনায় জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বর্ষায় কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) গঠন করা হবে, যারা জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠে সক্রিয় থাকবেন। ইতোমধ্যে প্রশাসক সেই টিম গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ক্যাচপিট, ড্রেন, খাল, পাম্পিং স্টেশন, নদীসহ সবকিছুর বাধা দূর করতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ময়লা-আবর্জনা, খাল দখল ও ভরাট, পাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নদী খনন করতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কাজ করলে সমাধান মিলবে।

 

আরও পড়ুন

×