প্রযুক্তি না বুঝে ব্যাংকিংয়ের বিপদ

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০   

ম. রাশেদুল হাসান খান

ম. রাশেদুল হাসান খান

ম. রাশেদুল হাসান খান

প্রতি দশকে বিশ্বের তাবৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য ও সমন্বয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তি ব্যবহারে বিপ্লব সাধিত হয়েছে, যা সবার কাছেই দৃশ্যমান। নতুন সহস্রাব্দের দুই দশক পরে, অর্থাৎ তৃতীয় দশকের সূচনালগ্নে নতুন বিপ্লবের কড়া নাড়ার প্রাক্কালেই করোনা নামক অদৃশ্য প্রাণঘাতী জীবাণু অনেকটা বাধ্য হয়েই নতুন প্রযুক্তির প্রায়োগিক বাস্তবতার প্রতিফলন শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানেই নয়, প্রাত্যহিক জীবনেও প্রকটভাবে প্রভাব ফেলেছে। ব্যাংকিং সেবা ব্যবস্থার কর্মী হিসেবে যারা সম্পৃক্ত তাদেরও প্রযুক্তি চিন্তার তথা সক্ষমতার ব্যাপ্তি প্রসারিত করার সময় এসেছে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী দিকনির্দেশনাও বিভিন্ন বিধি-প্রবিধি ও নীতিমালাতে মোড়া সমাজেরই প্রয়োজনীয়তার দর্পণ। যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সেবার নীতির প্রবর্তন বা প্রয়োগের বিশদ দিকনির্দেশনায় আমাদের ভবিষ্যৎ করণীয় ও বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামঞ্জস্যের মেলবন্ধনের কথাই বলে দিচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের অর্থ-প্রযুক্তির একীভূতকরণ ও সেবায় নতুনত্ব আনয়নে ব্যাপক প্রচার ও প্রসার; সর্বোপরি ভোক্তাদের স্বাচ্ছন্দ্যতায় পরিষেবাগুলো ব্যাপক সমাদৃত ও আলোচিত। প্রতিথযশা দেশীয় পত্রিকার বাণিজ্য পাতা, বাণিজ্য পত্রিকা কিংবা আন্তর্জাতিক ব্লমবার্গ পোর্টাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের অঙ্কিত রেখাচিত্রের গ্রহণযোগ্যতা শুধু উল্লল্ফম্ফনই নয়, ভালো লাগার ধনাত্মক বঙ্কিমতা ও বিশেষ শ্রেণির গ্রাহককুলের স্বাচ্ছন্দ্য আপামর জনগোষ্ঠীর গ্রহণযোগ্যতারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত।

পরিপূর্ণভাবে পরিষেবাগুলোর সুফল পেতে হলে অবশ্যই প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরাপত্তার সম্যক ধারণা নিতে হবে, যাতে অহেতুক অনভিপ্রেত ত্রুটি-বিচ্যুতিতে প্রচলিত ধারার অযাচিত ব্যত্যয় না হয়। এই ক্ষেত্রে 'ব্যাংকিং বুঝি কিন্তু কম্পিউটার বুঝি না' মানসিকতা পরিহার অতি আবশ্যক। অথবা সময় বাঁচানোর তুচ্ছ কারণবশত কার্ড ও পিন উভয়ই পিয়নকে দিয়ে এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলন কিংবা অতি যত্নে কার্ডের পেছনে পিন লিখে রাখাও ভবিষ্যতে সংশ্নিষ্ট গ্রাহকের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে, এটা প্রায় সুনিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া যায়। অপরদিকে মুঠোফোন অর্থ-প্রযুক্তির পরিষেবায় 'পিন ও মোবাইল' দোকানীকে দিয়ে অর্থ প্রেরণ, উত্তোলন বা স্থানান্তর ঝুঁকিতে মাত্রা বাড়িয়েছে।

গ্রাহককুলের তথ্য-উপাত্তের নিরাপত্তাকল্পে বহুল ব্যবহূত স্বনামধন্য ও বিশ্বে পরীক্ষিত ফ্রেমওয়ার্ক পরিপালন করে বিভিন্ন ব্যাংক গ্রাহকের তথ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই খুদেবার্তায় পুরো হিসাব নম্বর বা ক্রেডিট কার্ড নম্বর প্রকাশ করে না, যাতে কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের তথ্য 'বেহাত' না হয়ে যায়। এমনকি টেলিব্যাংকিংয়ের প্রশিক্ষিত নির্বাহীদেরও পূর্ণ হিসাব নম্বর বা ক্রেডিট কার্ড নম্বর চাওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য বাতায়নে নিষেধ আরোপিত হয়েছে। ওই নম্বরগুলো বিভিন্নভাবে মাস্কিং বা গুপ্তাক্ষরে করা থাকে, যাতে কেবল প্রকৃত ভোক্তারাই এই সুবিধা বা তাৎক্ষণিক নির্দেশনা বা অনুমোদিত সেবার সর্বশেষ স্থিতিপ্রাপ্ত হন তাদের নিজ নিজ গ্রাহকসেবার প্ল্যাটফর্মে, যেমন তাদের নিবন্ধিত মুঠোফোনে কিংবা ইমেইলে।

বর্তমানে ব্যাংকিং পেশায় নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে মেলে ধরতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারিক জ্ঞান ও তৎসঙ্গে এর নিরাপত্তার বিধির প্রায়োগিক পন্থাগুলোর সম্ভাব্য সক্ষমতার বলয় প্রসারিত করা সময়ের দাবি। অধুনা ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন সেবার একীভূতকরণে সৃষ্ট ডাটাবেইসের অ্যাসিড আচরণে 'আকলন-বিকলন'- এর পরিবর্তনের সঙ্গে প্রাপ্ত তথ্যউপাত্তের নিরাপত্তা প্রদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই 'কোর ব্যাংকিং' ব্যবস্থাপনায়। ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকারদেরও সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে; কখন, কীভাবে ও কত দ্রুত গ্রাহকদের সেবা নিশ্চিত করা যায় তথ্য-নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণে, বিশেষ করে দ্বি-স্তরের বলয় ব্যবহার করে। বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহণের প্ল্যাটফর্মে গ্রাহকের নিবন্ধিত মুঠোফোন নম্বরে প্রাপ্ত 'ওটিপি' ব্যবহার ও তার কার্যকারিতার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত ভোক্তা চিহ্নিতকরণ, সঠিকতা, প্রাপ্যতাও প্রযুক্তি সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। প্রকৃত অর্থেই অপেক্ষাকৃত উচ্চমান আকলন-বিকলনের ওটিপি বা একবারের স্বল্প সময়ের পাসওয়ার্ড অনেকাংশেই ভুলভ্রান্তি বা বিচ্যুতি তো বটেই, ঈপ্সিত সেবার মানেও গ্রাহক কর্তৃক নির্দেশনা প্রাপ্তির মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। এমনকি, ভিনদেশীয় মুদ্রার লেনদেনেও এ ধরনের দ্বি-স্তরের নিরাপত্তাবলয় শুধুই গ্রাহককুল নয় বরং যারা এই লেনদেনের অনুমোদনে সরাসরি সম্পৃক্ত তাদেরও জবাবদিহির বলয়ে আনা সম্ভবপর প্রায় নিখরচে।

হয়তো নিকট ভবিষ্যতে গ্রাহকের দেওয়া মুঠোফোন নম্বরটিই শুধু প্রধান ও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গ্রাহক পরিচিতি হয়ে উঠবে, যেখানে গ্রাহকের প্রায় সব তথ্যই- যেমন জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য ইত্যাদির সমন্বয়ে 'টেলকো' কর্তৃক যথাযথভাবে পরীক্ষিত ও অনুমোদিতও বটে। বর্তমানে ই-কেয়াইসি কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্দেশনা বাস্তবায়নে ও বিভিন্ন অর্থ-প্রযুক্তি বা ফিনটেকের এক অনন্য মাধ্যম গ্রাহক পরিচিতির অনুমোদনের ক্ষেত্রে। বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও অর্থ-প্রযুক্তির আওতায় যে কোনো প্রযুক্তি সেবা গ্রহণে মুঠোফোন নম্বরটি সর্বোচ্চ ব্যবহারিক মাধ্যম 'ওটিপি'র ক্ষেত্রে, যার মাধ্যমে দ্বি-স্তরের নিরাপত্তার বলয় গ্রহণ করে সেবা গ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।

অতি আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আইওটি, আইইটি, বিগ ডাটা, ব্লক চেইন, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, মোবাইল কম্পিউটিং, ফিনটেক ইত্যাদি বিষয় একীভূত হয়ে সমাজ ব্যবস্থায় এক নতুন ধারায় প্রবাহিত করবে, যেখানে প্রযুক্তির কল্যাণে ঘরে বসেই ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারা ভাবনার বিষয়ে আটকে না থেকে বাস্তবেই হবে। সেই লক্ষ্যে প্রযুক্তির প্রায়োগিক প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গেই নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্বারোপ আরও জরুরি। কেননা প্রযুক্তি চৌর্যবৃত্তির সবচেয়ে বড় বলির তিলক আমাদের কপালে এখনও বিচারাধীন অবস্থায় সেঁটে রয়েছে। একীভূতকরণের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাই হচ্ছে কোনাে একটি পরিষেবার ত্রুটির আপসে গোটা ব্যবস্থাপনাতেই প্রভাব পড়া, মানে ঝুঁকিপ্রবণ হওয়ার সম্ভাবনার মাত্রা বহুলাংশে বেড়ে যাওয়া। একত্রিত বা একীভূত সেবার প্ল্যাটফর্ম বা চিহ্নিত যন্ত্রগুলোকে স্বতন্ত্র, দৃঢ় ও গুপ্তাক্ষরিক নীতিমালায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে অত্যন্ত ক্ষুদ্র বিচ্যুতিও সমগ্র প্রযুক্তি ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন করবে; সেইসঙ্গে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও নেহাত অমূলক বিবেচনা করা সমীচীন হবে না। এক্ষেত্রে নিজে সর্বদা প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বতঃস্টম্ফূর্ত থাকা ও সম্যক ধারণা নিয়ে সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করে সচেতনতার পরিবেশ তৈরি করতে সচেষ্ট হলেই ঝুঁকির মাত্রা সহনীয়ভাবে কমানো সম্ভব।

আসুন সবাই এই বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এক বলিষ্ঠ শ্রমিক হই এই পরিবর্তিত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সমাজ ব্যবস্থায়; ঝুঁকি বা ভয়ের ভ্রুকুটিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে।

লেখক : ব্যাংকার

mrhkhan@gmail.com