ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ফুলগুলো ঝরছে কেন?

মতামত

ফুলগুলো ঝরছে কেন?

পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণেই শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নেয় সবচেয়ে বেশি

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ০৮:৫৪ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ০৪:০২

শিক্ষার্থীর আত্মহননের প্রবণতা নতুন না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যাটি অনেক বেড়েছে। কিছুদিন আগে অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হলো আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এ বছর দিবসটির আগের দিন প্রকাশিত বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৬৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। ৮ মাসের হিসাবে প্রতি মাসের হিসাবে গড়ে ৪৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করলে দ্বিগুণের বেশি। যেখানে ২০২০ সালের জুন থেকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল ১৫১ শিক্ষার্থীর আত্মহননের খবর।

শিক্ষার্থীরা নানা কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। সম্প্রতি রাজধানীর হলি ক্রস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী পারপিতা ফাইহা আত্মহত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার মৃত্যুর জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমরা দেখেছি। তদন্ত কমিটি প্রাইভেট না পড়লে অকৃতকার্য করানোর অভিযোগের প্রমাণ না পেলেও কঠিন প্রশ্নপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনে ভীতি সঞ্চার করে কৌশলে শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করার তথ্য পেয়েছে কমিটি। ঘুরেফিরে প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়টি যেভাবে উঠে এসেছে তা হতাশাজনক। একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে ঠিকভাবে পড়ানো। শ্রেণিকক্ষে পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন না করে তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত করেন? শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা কারণে বৈষম্যেরও সৃষ্টি করে। যে শিক্ষার্থীর প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই সে কী করবে? প্রাইভেট না পড়লে যদি নাম্বার কম দেওয়া হয় কিংবা পরীক্ষায় 'ফেল' করানো হয় এমন বাস্তবতা যদি একজন শিক্ষকই তৈরি করেন তবে শিক্ষার্থীর আত্মহননে প্ররোচিত হওয়া ছাড়া উপায় কী! 

এটা স্পষ্ট, অকৃতকার্য হওয়ার কারণেই শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নেয় সবচেয়ে বেশি। ঠিক এ কারণেই আমরা দেখি, প্রতিবছর এসএসসি বা এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার পর অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ এমন আত্মহননের পথ বেছে নেয়। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণেও শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভুগে থাকে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সমকালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে বেতন দিতে না পারায় বিদ্যালয়ের পরীক্ষার হল থেকে বের করে দেওয়ায় এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। কাঙ্ক্ষিত বিষয় নিয়ে পড়তে না পারার কারণে যেমন শিক্ষার্থীর আত্মহননের অঘটন ঘটেছে, তেমনি পারিবারিক টানাপোড়েনের মতো ছোটোখাটো বিষয়েও অনেকে এ পথে বা বাড়ায়।

বয়সে ছোট হওয়ার কারণে অনেক সাধারণ বিষয় শিক্ষার্থীরা অনেক বড় করে দেখে। তার সঙ্গে যখন জীবনের সফলতার বিষয়টি জুড়ে দেওয়া তখনই তারা মনে করে, এটা না হওয়া মানে জীবন বৃথা। অভিভাবক, সমাজ কিংবা পারিপার্শ্বিকতা 'ভালো' ফলকে যেভাবে দেখানো হয় তাতে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের চাপের মধ্যে থাকে। এসব আত্মহনন আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। কারণ, তাদের আমরা বোঝাতে পারিনি অকৃতকার্য হওয়া খুব সমস্যার বিষয় বা অকৃতকার্য হওয়া, জিপিএ-৫ না পাওয়া মানেই জীবনের শেষ নয়। 

কেবল স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, এ বছরের শুরুতে আঁচল ফাউন্ডেশনের আরেকটি প্রতিবেদনে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। করোনার কারণে গত বছর আর্থিক টানাপোড়েন, পড়াশোনা কিংবা পরীক্ষা নিয়ে হতাশা, পারিবারিক সংকট প্রভৃতি কারণে শিক্ষার্থীরা আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে। 

এ সময়ে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রবণতা কেন বেড়েছে? শিক্ষার্থীর ওপর চাপ কিংবা পরীক্ষার ফলের বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি শিক্ষার্থীর পারিপার্শ্বিকতা ও জগৎ ছোট হয়ে আসাও একটা কারণ হতে পারে। অনেকের ডিভাইস আসক্তির প্রভাব যেমন থাকতে পারে, তেমনি খেলার মাঠ কমে যাওয়াসহ বড় পরিবারে বৃহত্তর পরিবেশ না পাওয়া এবং শিক্ষার্থীর সমস্যাগুলো বলার মতো নির্ভরযোগ্য পরিবারের সদস্য না পাওয়ার প্রভাব থাকাও অস্বাভাবিক নয়। মা-বাবা কিংবা পরিবারের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক হওয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা থাকা এবং শিক্ষকদের সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ নিশ্চয়ই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে জীবনটা সুন্দর এবং অনেক বড়। সামান্য বিষয়ে ফুলগুলো এভাবে ঝরে পড়তে পারে না। 

আরও পড়ুন

×