আইএলওর প্রতিবেদন
উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০০
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মজীবী। পুরুষের চেয়ে নারীর আয় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কম। প্রায় সব খাতেই এ বৈষম্য বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
‘বাংলাদেশে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান: প্রবণতা, কারণ ও নীতিগত করণীয়’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপে তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি। তবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে এই বৈষম্যের হার কিছুটা কম।
মজুরি বৈষম্যের কারণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মজুরিভিত্তিক কর্মীদের এই আয়ের পার্থক্যের বড় অংশই কোনো দৃশ্যমান উপাদান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। শিক্ষা, পেশা ও খাতের ভিন্নতা এই বৈষম্যের শুধু একটি আংশিক কারণ তুলে ধরা যায়। তবে মূল কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না।
কম আয়ের পাশাপাশি মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণের হার পুরুষের চেয়ে অনেক কম। আইএলওর প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে পুরুষের কর্মসংস্থানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা নারীর ছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান হারের ব্যবধান ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। কর্মরত নারীদের মাত্র ১৯ শতাংশ মজুরিভিত্তিক কর্মী। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৮ শতাংশ।
নারী-পুরুষ আয় বৈষম্যে বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, মজুরির এই বৈষম্য মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কৃষিসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক সব খাতেই এ রকম মজুরি বৈষম্য রয়েছে। কৃষিকাজে একে তো মজুরি কম, তার ওপর আবার বৈষম্য।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ঘোষণা দিয়ে পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক মজুরি দেওয়া হয় নারী শ্রমিককে। নারীর এই মজুরি বৈষম্যের কারণে সে পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে একাধিক বিয়ের এটা অন্যতম বড় কারণ। তিনি বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সরকারি-বেসরকারিনির্বিশেষে একটা জাতীয় মজুরি কাঠামো গঠনের সুপারিশ করেছেন তারা। যাতে একজন শ্রমিক তার মজুরি দিয়ে পরিবার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে। এ ছাড়া শ্রমিকের একটা তথ্য ব্যাংক ও পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা এবং অন্তত জেলা পর্যায়ে শ্রমবিষয়ক অভিযোগে প্রতিকার দেওয়ার জন্য সরকারি নির্দিষ্ট দপ্তর প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছেন তারা, যাতে শ্রমিক তার যে কোনো বঞ্চনা জানিয়ে সহজেই প্রতিকার পেতে পারেন।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈপরীত্য দেখা যায়। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী। এই উচ্চশিক্ষিত নারীদের মধ্যে কর্মজীবী বা অন্যান্য আয়ভিত্তিক কাজের মধ্যে আছেন মাত্র ৫ শতাংশ নারী। নারীরা তুলনামূলকভাবে নিম্ন মজুরির পেশায় বেশি কাজ করেন। নারীদের মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ উৎপাদন খাতে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ১৯ শতাংশ নারী গৃহস্থালি কাজে ও ১২ শতাংশ শিক্ষা খাতে নিয়োজিত।
অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি যথেষ্ট কম। দেশের ব্যবস্থাপনা পদগুলোতে কর্মরত নারীর সংখ্যা মাত্র ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের চেয়েও কম। দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৩০ শতাংশ।
আইএলওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গৃহস্থালির কাজে বেশি সময় দেওয়ার কারণে নারীদের পক্ষে উচ্চ মজুরির কাজ নেওয়া এবং ক্যারিয়ারে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। বাসাবাড়িতে নারীরাই বেশি কাজ করে থাকেন। বাইরে কাজ করে বাসায় ফিরে নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালির কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে মাত্র ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। কর্মক্ষেত্রে পুরুষরা সপ্তাহে গড়ে ৫১ দশমিক ৯ ঘণ্টা এবং নারীরা ৪৬ ঘণ্টা কাজ করেন। এমন নারীদের ৭৭ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন; পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৯০ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে সব খাত সমানভাবে আসে না। নারীরা যেসব কাজে বেশি অংশগ্রহণ করেন, সেই খাতগুলোর কাজের মূল্যায়নে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত আছে কিনা, তাও বর্তমান মজুরি নির্ধারণ ব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা হয় না।
নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের পেছনে শুধু একই কাজের জন্য ভিন্ন মজুরির বিষয়টি দায়ী নয়। বরং মজুরি নির্ধারণের দুর্বলতা, নিম্ন মজুরির কাজে নারীদের বেশি অংশগ্রহণ, ঘরের কাজের বাড়তি চাপ ও সামগ্রিকভাবে কম মজুরির শ্রমবাজার। সব মিলিয়ে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের পেছনে এসব কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক কারণ কাজ করছে।
এই অবস্থার পরিবর্তনে সমমজুরি প্রতিষ্ঠা এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমবাজার গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন তাকিদসহ বেশ কিছু সুপারিশ করা হয় আইএলওর প্রতিবেদেন। একই ধরনের কাজের জন্য সমান মজুরির নীতি কার্যকর করা, কাজের মূল্যায়নে নিরপেক্ষ পদ্ধতি চালু, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে লিঙ্গবৈষম্য বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয় আইএলওর পক্ষ থেকে। এ ছাড়া মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান পুনর্বিবেচনা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধ নিশ্চিত করা, শ্রম পরিদর্শন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলেছে আইএলও।
- বিষয় :
- আইএলও