ব্যবসায়ীদের শঙ্কা, পণ্যমূল্য বাড়বে সুযোগ নিলে ব্যবস্থা নেবে সরকার
সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গতকাল সোমবার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভা হয়েছে। এতে অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানোয় নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, এর প্রভাবে উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও বাজারজাতকরণে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেওয়া হবে না। কেউ অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ালে বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম এবং ডাল, তেল, খেজুর, ডিম ও চিনি আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশকেও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয়। সরকার ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ একবারে না দিয়ে একটি অংশ বহন করলে শেষ পর্যন্ত তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপরই পড়ে। তবে বাজার ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর কাঠামোর বিভিন্ন দিকও পর্যালোচনা করা হবে।
সভায় ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে নিত্যপণ্যের চাহিদা, আমদানি, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতির একটি চিত্র উপস্থাপন করা হয়। এতে জানানো হয়, গত বছরের তুলনায় দেশে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি খোলার পরিস্থিতি ইতিবাচক। দেশে মসুর ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় সাত লাখ টন। গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪২ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে এক লাখ ছয় হাজার টনে পৌঁছেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ট্রেসেবিলিটি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পণ্যের সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ডিম ও প পোলট্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যকে এ কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাজার পরিস্থিতি
জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পর গতকাল সোমবার রাজধানী ঢাকার একাধিক মুদি, মাছ ও কাঁচাবাজারে ঘুরে তাৎক্ষণিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়নি। খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতারা জানান, গত কয়েক দিনের দরের থেকে কোনো পার্থক্য নেই।
ঢাকার মতিঝিল ব্যাংক কলোনি কাঁচাবাজার এবং রাজধানীর বৃহত্তম বাজার কারওরান বাজারের সবজি, মাছ, মুরগি ও মুদি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা হয়। ব্যাংক কলোনি বাজারের সবজি বিক্রেতা আব্দুল্লাহ জানান, গতকাল তিনি শসা ৬০, টমেটো ১৮০ ও ঝিঙা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছেন। এগুলো রোববারের দামের তুলনায় কোনো পরিবর্তন নেই। এ বাজারের আরেক খুচরা বিক্রেতা আলম জানান, আগের দামেই কাঁকরোল, শিম ও আলু বিক্রি করছেন।
একই বাজারে পেঁয়াজ ও রসুন বিক্রেতা মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানান, তিনি গতকাল হাইব্রিড পেঁয়াজ ৩৮-৩৯, দেশি পেঁয়াজ ৪০-৪৫, শুকনা মরিচ ৪৪০-৪৫০ এবং চীনা রসুন ১৩৫-১৪০ টাকায় বিক্রি করেছেন। গত কয়েক দিনের মতো দর একই রয়েছে বলে ভাষ্য তাঁর। মুরগি বিক্রেতা রাহাত জানান, গতকাল তিনি দেশি মুরগি ৬৫০ ও ব্রয়লার ১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছেন, যা রোববারের দরের সমান।
বগুড়ার মহাস্থানগড় বাজারের অন্যতম বড় পাইকার মো. তাহেরুল জানান, তেলের দাম বাড়লেও এখনও কাঁচামাল বহনকারী গাড়ির ভাড়া বাড়েনি। ট্রাক ভাড়া বাড়ালেও তাতে সবজির মূল্যে প্রভাব পড়ার কারণ নেই। তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়লে পাঁচ থেকে ১০ টনের কাঁচামালের ট্রাকে ঢাকা বা অন্যান্য স্থানে পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে পরিবহন খরচ সর্বোচ্চ ২৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
কারওরান বাজারের ইসলামপুর বাণিজ্যালয় নামের আড়তের পাইকার কামালের সাথে কথা হলে তিনি জানান গতকাল কাঁচামরিচ বিক্রি করেছেন ১২০ টাকা কেজি দরে। তিনি আরও জানান, গতকালের এ দর এক-দুই দিন আগের চেয়ে কিছুটা কম।
কারওরান বাজারে কথা হয় ক্রেতা রাফসান জামানের সঙ্গে। কিছুটা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে রামপুরা থেকে এ বাজারে এসেছেন। তিনি বলেন, বাজারে সবকিছুর দাম চড়া। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বিক্রেতারা আরেক দফা পণ্যমূল্য বাড়াবে বলে আশঙ্কা তাঁর। তিনি বলেন, এটা সব সময় হয়ে আসছে। যার যত সমস্যা, তার সব ভার ভোক্তাকেই বইতে হয়। তাঁর মতো কয়েকজন ক্রেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, জ্বালানি তেলের দর বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অজুহাত তৈরি করে অযৌক্তিকভাবে পণ্যমূল্য যাতে না বাড়ে সে বিষয়ে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে।
ট্রাক ড্রাইভারের কথা
তেলের দাম বৃদ্ধির পর গতকাল বিকেলে মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স পেট্রোল পাম্পের সামনে ডিজেল কেনার সময় কথা হয় কাভার্ডভ্যান মালিক ও চালক আলী হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বাড়তি ভাড়া চাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আগে ভাড়া লইতাম দেড় হাজার টাকা, এখন ২০০ টাকা বাড়তি চাইতে হবে।’
- বিষয় :
- সচিবালয়