সুদহারের ব্যবধান নির্ধারিত সীমায় আনতে পারেনি বেশির ভাগ ব্যাংক
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের মধ্যে সুদহারের গড় ব্যবধান বা স্প্রেড সর্বোচ্চ চার শতাংশে রাখার নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। বেশির ভাগ ব্যাংক এ নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হয়েছে। গত জুলাইতে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ বাদে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আগের মাস জুনে যা ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ ছিল।
গত জুন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়–ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে স্প্রেডের ব্যবধান ৪ শতাংশে রাখতে হবে। এ বিষয়ে জারি করা সার্কুলারে বলা হয়, অনেক ব্যাংকের আমানতের সুদহারের তুলনায় ঋণের সুদ অনেক বেশি নির্ধারণ করছে। এর ফলে স্প্রেড অনেক বেড়েছে। ব্যবসা, শিল্প প্রবৃদ্ধিকে যা বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ঋণ ও আমানতের মধ্যকার সুদহারের গড় ব্যবধানের তিন ধরনের হিসাব প্রকাশ করে আসছে। এগুলো হচ্ছে–ভোক্তাঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ছাড়া গড় সুদ, শুধু ক্রেডিট কার্ড বাদ দিয়ে গড় সুদ এবং সব ধরনের ঋণের গড় সুদ। জুলাইতে সামগ্রিক ব্যাংক খাতের আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ঋণে ১১ দশমিক ৮১ শতাংশ। এতে করে স্প্রেড দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। আমানতে সবক্ষেত্রে অভিন্ন সুদ হলেও ঋণের সুদহারে ভিন্নতার কারণে ক্রেডিট কার্ড বাদে গড় সুদ ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ছিল। এতে করে এক্ষেত্রে স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ বাদে গড় সুদ ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ হওয়ায় এক্ষেত্রে স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকের গড় স্প্রেড রয়েছে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ সোনালী ব্যাংকের এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের রয়েছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে। এর মধ্যে তিনটি ব্যাংক ছাড়া অন্য সবার স্প্রেড নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে। বর্তমানে ঋণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকা এবি ব্যাংকের স্প্রেড রয়েছে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশে। আর মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের স্প্রেড ৩ দশমিক ৫৮ এবং মেঘনা ব্যাংকের রয়েছে ৪ শতাংশে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর স্প্রেড রয়েছে ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশে। বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে রয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান সমকালকে বলেন, ব্যাংকগুলো এখন ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে স্প্রেডের হিসাব করছে। সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন ও গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর কাজ চলছে। এটি হয়ে গেলে আর হয়তো বেশির ভাগ ব্যাংক নির্ধারিত সীমার নিচে থাকবে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে সোনালী ব্যাংকের স্প্রেড ৫ শতাংশের ওপরে দেখালেও অন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করলে ৪ শতাংশের নিচে রয়েছে।
বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, শুধু আমানত ও ঋণের গড় হিসাব করে গ্রস ভিত্তিতে এখন স্প্রেডের হিসাবায়ন হচ্ছে। গ্রস হিসাব না করে নিট ভিত্তিতে করার জন্য তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এটি হলে হয়তো আরও অনেক ব্যাংক নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে গড় স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সেখান থেকে বেড়ে পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়। এর পরের দুই মাস ৫ দশমিক ৭২ শতাংশে ছিল। পরের মাস মে মাসে ৫ দশমিক ৭০ শতাংশে নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের একটি অংশ এক ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আরেক ব্যাংকে রাখছেন। টাকা রাখার ক্ষেত্রে সুদহারের চেয়ে যথাসময়ে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তার বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। ফলে কিছু ব্যাংকে আমানতের গড় সুদহার অনেক কমে যাচ্ছে। এসব ব্যাংক ঋণের সুদহার সেভাবে কমাচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংকগুলোর স্প্রেড বেশি। এসব বিবেচনায় ব্যাংকগুলোর স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ব্যাংকে এই নির্দেশনা অবশ্যই পরিপালন করতে হবে। ইতোমধ্যে এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কোনো ব্যাংক না মানলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ব্যাংক