জনগণকে আস্থায় নিতে হবে

বাংলাদেশ-ভারত

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ইমতিয়াজ আহমেদ

শনিবার নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে সীমান্তের দুই পাশেই উৎসাহ কম ছিল না। কিন্তু দিনের শেষে সীমান্তের এপাশে জনসাধারণের মধ্যে সেই উৎসাহ যেন অনেকটা মিইয়ে গেছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। ওই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে যেসব নথি স্বাক্ষরিত বা বিনিময় হয়েছে, তাতে করে মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, ভারতই লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কী পেয়েছে, তা আলোচনার বিষয়।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফর প্রথাগত রাষ্ট্রীয় সফর নয় এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি মূলত নয়াদিল্লির আগ্রহেই হয়েছে। ভারতের পক্ষে শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সভায় যোগ দিতে। একই সঙ্গে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সফরটির আগে থেকে বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে আশাবাদ ছিল যে, এবার তিস্তা নিয়ে একটি সুরাহা হতে পারে। এ ছাড়া আসামে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়েও ভারতের পক্ষে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসতে পারে। দুই পক্ষে যদিও সাতটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তার মধ্যে তিস্তা ও এনআরসি নিয়ে কিছু নেই।

এবারের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রবণতা ও মনোভঙ্গি দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, তারা মনে করে বাংলাদেশের সরকারকে নানাভাবে সন্তুষ্ট করা গেলেই হলো। নয়াদিল্লি যেন মনে করে, বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্কই বড় বিষয়। এখানকার জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

সন্দেহ নেই, শেখ হাসিনাও গত তিন মেয়াদে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন, যাতে করে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়। মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তির কারণে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়া ওই চুক্তি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের টানা দুই মেয়াদেও আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, তিস্তার পানি বণ্টনে নয়াদিল্লি আসলেই কতটা আন্তরিক?

এবারের সফরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের জনসাধারণের অপেক্ষায় থাকার কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। নরেন্দ্র মোদিও যথারীতি তাদের সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে 'যত দ্রুত সম্ভব' বিষয়টি সুরাহা করার কথা বলেছেন। তিস্তা চুক্তি নিয়ে এ পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে- এবারও তিস্তার কোনো অগ্রগতি হলো না! এই হতাশা আরও বেড়ে যায়, যখন আমরা দেখছি বরং অতি সহজেই ফেনী নদীর পানি ভারত পেয়ে গেল। এ ক্ষেত্রে আদর্শ পরিস্থিতি হতে পারত তিস্তা চুক্তির একটি সুরাহা হওয়ার পর ফেনীর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।

উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে নদীবিষয়ক দরকষাকষির ক্ষেত্রে ভাটির দেশ বাংলাদেশের বাস্তবতা বোধগম্য। কিন্তু ফেনী নদীর পানি উত্তোলনের ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার আগে তিস্তার ইস্যু সম্পন্ন করায় জোর দিতে পারত ঢাকা। বিষয়টি ভারতের দিক থেকেও ভাবা উচিত ছিল। একটি নদীর ব্যাপারে এতদিন ধরে আলোচনা চলছে এবং কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাচ্ছে না। তার আগেই আরেকটি নদী থেকে নয়াদিল্লি সুবিধা নিতে চেয়ে বাংলাদেশের জনগণের আস্থাহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আগেই বলেছি, সাম্প্রতিককালে ভারত সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তাদের যতটা তাগিদ, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে ততটা উৎসাহ নেই। তিস্তার ব্যাপারে হতাশা তৈরি করে ফেনীর পানি উত্তোলনে চুক্তি আদায় করে তারা সেটা আরেকবার প্রমাণ দিল।

প্রতিবেশী দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার ব্যাপারে এই উন্নাসিকতার পরিণতি ভালো হয় না। যে কোনো চুক্তি করে ফেলা যেমন-তেমন, তা বাস্তবায়ন ও টেকসই করতে পারা তার চেয়ে বেশি জটিল। নেপালে জনসাধারণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কাঠমান্ডু ও নয়াদিল্লির মধ্যে সরকার পর্যায়ে মহাকালী নদী চুক্তির ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিস্তা চুক্তি না করার ক্ষেত্রে ভারত পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কথা জানাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষের আপত্তির কথা না ভেবেই তারা ফেনী নদীর ব্যাপারে সমঝোতা করে ফেলল! দ্বিপক্ষীয় যে কোনো চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে। একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে আরও সহযোগিতা ও বিনিময়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। কিন্তু ফেনী নদীর পানি উত্তোলন সংক্রান্ত চুক্তি এ ক্ষেত্রে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

আমাদের সরকার অবশ্য প্রমাণ দিয়েছে যে, তারা ভারতের জনগণের কথা ভাবে। ফেনী নদীর চুক্তির মাধ্যমে আমরা আরেকবার প্রমাণ দিয়েছি, ভারতের জনসাধারণের মঙ্গলার্থে বাংলাদেশ সবসময়ই উদ্যোগী। বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারের এই বিপরীতমুখী প্রবণতার প্রমাণ আমরা আগেও দেখেছি। বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে দেখতে পাওয়ার ব্যাপারে আমরা যখনই বলছি, নয়াদিল্লি নানা অজুহাত তুলে এড়িয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত এমন সময় সেখানে বিটিভি দেখানোর অনুমতি দেওয়া হলো, যখন আমাদের উপগ্রহ আকাশে চলে গেছে। এখন এর আর কোনো মূল্য নেই। অথচ প্রথমেই রাজি হলে ভারতের সরকার বাংলাদেশের জনগণের ব্যাপক সমর্থন পেত। অন্যদিকে আমরা প্রথম থেকেই বাংলাদেশের আকাশ ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছি।

আমি মনে করি, ভারতের সরকারের এই প্রবণতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সরকারকেও নতুন করে ভাবতে হবে। সরকারকে অবশ্যই জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া আমলে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিকভাবেও বাংলাদেশকে ভাবতে হবে ভারত কতটা নির্ভরযোগ্য। প্রতিবেশী একটি দেশের নীতিনির্ধারকরা যদি শুধু নিতেই চায়, দিতে চায় না; তাহলে সেই দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব টেকসই হবে কীভাবে? কূটনীতির ক্ষেত্রে আমাদের একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব বজায় রাখতে হবে।

তিস্তা বা ফেনী ইস্যু শুধু নয়; ভারত-বাংলাদেশ নৌ প্রটোকল থেকে উপকূলীয় নজরদারি সমঝোতা- সবকিছুতেই স্পষ্ট হয়েছে নয়াদিল্লি নেওয়ার ব্যাপারে যতটা উৎসাহী, দেওয়ার ব্যাপারে ততটা নয়। কূটনীতির এই প্রবণতা ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর। দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্বায়নের পরিবর্তন ভারতের নীতিনির্ধারক ও কূটনীতিকরা ধরতে পারেননি। তারা বুঝতে পারছেন না, বন্ধুত্ব করতে হয় 'উইন উইন' পরিস্থিতি তৈরি করে। অন্যথায় সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলেও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কে ঘাটতি থেকে যায়।

এখন আর বড় দেশ ও ছোট দেশ বিবেচনায় কূটনীতি হয় না। ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে যে কোনো দেশই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবণতার কারণে ভারত নেপালের আস্থা হারিয়েছে, ভুটানের আস্থা আর আগের মতো নেই। নয়াদিল্লির বোঝা উচিত, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যদি উৎসাহবোধ না করে, যদি হতাশ হয়; তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বও নতুন স্তরে সম্প্রসারিত হবে না। বরং বিদ্যমান সম্পর্কে বারবার বাধা পাবে।

আমার আশা, বিশ্বায়নের এই যুগে ভারত তার বিংশ শতাব্দীর চিন্তাধারা পরিবর্তনে আগ্রহী হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো যত দ্রুত সম্ভব সমাধানে মনোযোগী হবে। সেটা বাংলাদেশের জন্য যেমন, তেমনি ভারতের জন্যও ভালো হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ