ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেসব প্রস্তুতি জরুরি

পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেসব প্রস্তুতি জরুরি
×

সালেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ মে ২০২২ | ১৫:২০

প্রায় বিশ্বব্যাপী করোনা-দুর্যোগের অভিঘাত অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যেভাবে লেগেছিল, তা কাটিয়ে ওঠা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে করোনা-উত্তর আমরা পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিচ্ছিলাম, চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রেখে। নানামুখী পদক্ষেপ কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এরই মধ্যে সৃষ্টি হলো ইউক্রেন সংকট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর বিরূপ প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বের চলমান ঘটনাবলির কারণে চ্যালেঞ্জের দাগটা আরও মোটা হয়ে উঠেছে। অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এখন সে ক্ষেত্রে কমবেশি বিরূপ ধাক্কা লাগবে বাস্তব কারণেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশকিছু প্রস্তুতি দরকার। আমাদের দায়িত্বশীলদের অবশ্যই দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। কোনোভাবেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে অবস্থা খারাপ হয়ে পড়তে পারে।

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি খাত প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাক শিল্প। এ দুই ক্ষেত্রেই একটু ভাটা পড়েছে। রিজার্ভ কমে আসছে। ডলারের দাম বেড়ে গেছে। ভোজ্যতেলসহ বেশকিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। নানা কারণে প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ম্ফীতির ওপর। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা দেখছি, আমাদের বড় শিল্পগুলো কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে বটে, কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে, এর দিকে গুরুত্ব সহকারে নজর দিতে হবে। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, সামাজিক ভারসাম্যের বিষয় যুক্ত। এর মধ্যেও আমরা দেখছি আর্থিক খাতে অনিয়ম ঘটেই চলেছে। ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের বিরূপ ফল হয়ে দাঁড়াচ্ছে নানামুখী। ব্যাংক ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত চিত্র এখনও বিদ্যমান। এসব সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতি আছে বটে, কিন্তু কার্যত কাজের কাজ সেভাবে হচ্ছে না। ব্যাংক খাতে সংস্কারের কথা বারবার বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কঠোর ও নির্মোহ অবস্থানের বিকল্প নেই।

কৃষি খাতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিঘাত লেগেছে। হাওরে উৎপাদিত ধান নষ্ট হয়ে গেছে বিপুল পরিমাণে। কৃষকের দুরবস্থার চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। কৃষি খাতে যে অভিঘাত লেগেছে, তা কাটিয়ে উঠতে বিশেষ নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কৃষক যাতে বিপন্নের তালিকায় না থাকে, এ জন্য নজর আরও গভীর করার পাশাপাশি তাদের কল্যাণে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে। এসবই সৃষ্ট নতুন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তবে পরিকল্পনা গ্রহণই শেষ কথা নয়; এর যথাযথ বাস্তবায়ন হলো আরেক চ্যালেঞ্জ। উল্লিখিত বিষয়গুলো আসন্ন বাজেটে যাতে গুরুত্ব পায় তা বিশেষভাবে আমলে রাখা আবশ্যক। গাণিতিক হিসাব তো বাজেট ঘিরে থাকবেই, কিন্তু গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে বিশেষ খেয়াল রেখে বাজেট প্রণীত হওয়া বাঞ্ছনীয়। মানে বিশেষ সময়ে, বিশেষ বাজেট দরকার।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সুশাসনের বিকল্প নেই। সুশাসন নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক সংকট গভীর হবে। হয়তো এক বছরে সব সম্ভব হবে না; কিন্তু লক্ষ্য থাকতে হবে সুনির্দিষ্ট। বাজেটে আরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দরকার যাতে সরকারি সম্পদের ওপর কোনো অভিঘাত না আসে। অপচয় রোধ করতে হবে। খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের পেছনে যাতে অর্থ ও সময় নষ্ট না হয় তাও নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা দেখেছি, কোনো কোনো সময় মূল্যহীন প্রকল্প নিয়ে অহেতুক দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। অনিয়ম, দুর্নীতির রাস্তা তৈরি হয় এ থেকেই। মনে রাখা দরকার, আয়ের সংস্থান যতটুকু করা যাবে, ব্যয়ও যেন সে অনুপাতে করা হয়। অনেক সময় দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য বাইরে থেকে ধারদেনা করা হয়। এর ফল শেষ পর্যন্ত ভালো হয়নি। আর এখন তো কঠিন সময়। এ রকম কিছু করার অবকাশ নেই।


ব্যয়ের ব্যাপারে সাশ্রয়ী হতেই হবে। প্রাধিকার ক্ষেত্রে ব্যয় হোক এবং মানুষের জীবনযাত্রা প্রকৃতই যাতে উন্নত করা যায়, সে লক্ষ্য থাকুক অগ্রভাগে। উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হোক একেবারে প্রযোজনের নিরিখে। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য টেকসই উন্নয়নে যা করা দরকার, তাতে যেন কোনো অস্বচ্ছতা না থাকে। অর্থ পাচার এখনও বন্ধ করা যায়নি। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার জোরালো চেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে। কিন্তু অর্থ পাচার যাতে না হয় সেটাই মূল কথা। এ ক্ষেত্রেও সুশাসনের বিষয়টি আসে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জবাবদিহির প্রসঙ্গ আসে। সরকারি কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা চাই। কর্মদক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হলে সুশাসনের পথ সুগম হতে বাধ্য। অনৈতিক কর্মকাণ্ড, অনিয়ম ইত্যাদি বিষয়ে সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু অ্যাকশন কতটা কী হয়েছে, দেখার বিষয় সেটিই। এখন আর পর্যবেক্ষণ নয়, দরকার অ্যাকশন।

বছরের পর বছর গড়িয়ে যায় দুর্নীতির মামলার নিষ্পত্তি হয় না। প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপই শুধু নয়; এর যাতে চূড়ান্ত সুরাহা মেলে সে লক্ষ্যে কাজ চালাতে হবে। তদন্তের নামে, সাক্ষ্য গ্রহণের নামে দীর্ঘসূত্রতার পথ দ্রুত রুদ্ধ করা জরুরি। তদন্ত হচ্ছে, হবে- এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে অর্থনীতিই শুধু নয়; সামাজিক ক্ষেত্রেও সমস্যা প্রকট হবে। এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে যাতে কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করার সাহস না পায়। অর্থ দেশ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তা কীভাবে আনা হলো, সেটা বড় কথা নয়। কীভাবে বের হয়, সেই পথটা চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নীতিমালা কাগজে-কলমে থেকে লাভ কী, যদি এর বাস্তবায়ন করা না যায়?

দেশের ব্যাংকগুলোর স্বচ্ছতা-জবাবদিহি অসন্তোষজনক। সুশাসন নিশ্চিত না হলে এসব ক্ষেত্রে সন্তোষজনক কিছু আশা করাও কঠিন। কারা অর্থ পাচার করছে, তাদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি কারা এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে, তাদেরও চিহ্নিত করা খুব জরুরি। এদের সবাইকে এক কাতারভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং স্বল্প সময়ে অপকর্মকারীদের দৃষ্টান্তযোগ্য দণ্ড নিশ্চিত করতে না পারলে অনাচার বন্ধ করা যাবে না। পর্যবেক্ষণ করুন, ভালো কথা। কিন্তু সমন্বিত পদক্ষেপের কথা ভুলে না গেলেই মঙ্গল। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টন না হওয়া।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু বণ্টন নিয়ে কি তত কথা শোনা যায়? প্রবৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সাধারণ মানুষ এর সুফল কতটা পাচ্ছে তা আমলে রাখতে হবে সমগুরুত্ব দিয়ে। তথ্য নিয়ে যেন জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি না হয়, তাও আমলে রাখা জরুরি। মূল্যস্ম্ফীতির ব্যাপারে এও মনে রাখতে হবে, আমাদের এখানে শুধু চাহিদাজনিত কারণে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে না; এর পেছনে অন্যরকম কারসাজি থাকে। দেশে সরবরাহজনিত কারণে যে মূল্যস্ম্ফীতি ঘটে, তাতেও স্পষ্ট- সুশাসনের ঘাটতির কারণেই তা সৃষ্ট। ব্যবস্থা ভালো করতে পারলে অবস্থা ভালো না হওয়ার তো কোনো কারণ নেই।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক; অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×