ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জন্মদিন

আলো জ্বালানো মানুষ

আলো জ্বালানো মানুষ
×

কামাল লোহানী: (১৯৩৪-২০২০)

কাজী মদীনা

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২১ | ১৫:৩৫

স্বপ্ন আর যৌবন- এ শব্দ দুটি খুব কাছাকাছি মনে হয়। কিন্তু জীবন তো নিছক সরলরৈখিক নয়। সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত পাল্টে দেয় জীবনাচরণ, মানুষের পরিচিতি। যে মানুষটিকে কখনও কিছুই পাল্টাতে পারেনি, তিনি সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দক্ষ সংগঠক, সুবক্তা, বাচিকশিল্পী, ধারাভাষ্যকার, নৃত্যশিল্পী, অভিনেতা, চেতনার বাতিঘর, জাতির বিবেক, স্বপ্নের সারথি কামাল লোহানী। তাই আমরা দেখি অশীতিপর একজন যুবক রাশি রাশি স্বপ্ন বুকে নিয়ে নানা রোগে জর্জরিত হয়েও বিরামহীন সংগ্রামমুখর চলমানতা অব্যাহত রেখে অক্লান্ত পথ হেঁটেছেন আমৃত্যু। প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর মানুষটি অকম্পিত আলোকশিখা সদা প্রজ্বলিত রেখেছেন জীবনভর।

কামাল লোহানী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। জন্মেছেন ব্রিটিশ আমলে। বেড়ে ওঠা ও কর্মজীবন শুরু পাকিস্তান আমলে। আর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে স্বপ্ন পূরণের জন্য আমৃত্যু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে আলোর পথে হেঁটেছেন। তারপর ব্যক্তি কামাল লোহানী থেকে একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠলেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কিশোর ছিলেন। ১৯৫৩ সালে পাবনা কলেজে পড়ার সময়ই সংগ্রামের রাজপথে হাঁটতে শুরু করেন। সেই বয়সেই ছিল তার ঈর্ষণীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা। একই সঙ্গে ছিল অসাধারণ বক্তৃতা দেওয়ার নিপুণতা। ভাষা আন্দোলনের সময় ১৯৫৩ সালে কারাবরণ করেন। '৫৪ সালে তিনি প্রগতিশীল বাম জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের রাজনৈতিক দীক্ষায় আপাদমস্তক মার্কসবাদী হয়ে উঠলেন। যুক্তফ্রন্টের জয়লাভের পর ১৯৫৪ সালের জুলাই মাসে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মার্শাল ল জারি হওয়ার পর তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন। '৫৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হলেন। '৬৭ সালের পর তিনি আর কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আদর্শগতভাবে মার্কসিস্ট ছিলেন। মওলানা ভাসানীর প্রতি ছিল তার অগাধ আনুগত্য।

'৬২ সালে পূর্ববাংলা যখন অগ্নিগর্ভ, ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি আবার গ্রেপ্তার হলেন। সেই সময় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম প্রমুখের সঙ্গে জেলে ছিলেন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ বদল করতে হলে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমেই করতে হবে। তিনি বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির সর্বজনীন লোকায়ত ধারা প্রবহমান রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। জি এ মান্নান পরিচালিত 'নকশীকাঁথার মাঠ' নৃত্যনাট্যে শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে অংশগ্রহণ করে এই ধারাটি প্রচার করেন।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পর সমমনাদের নিয়ে ছায়ানট গঠিত হয়। কামাল লোহানী ছায়ানটের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এবং প্রায় চার বছর অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে ছায়ানটকে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৬৭ সালে বড় পরিসরে 'ক্রান্তি ' সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলতেন, সংস্কৃতি চর্চা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, দেশ গড়ার কাজে লাগাতে পারলেই সঠিক সংস্কৃতি চর্চা করা হয়। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হিসেবে প্রবীণ বয়সেও সব শারীরিক সীমাবদ্ধতা ঝেড়ে ফেলে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে গিয়েছেন। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মধ্য আশির দশকে সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে যখন বন্ধ্যত্ব আসে, তিনি তখন ঐক্যবদ্ধ 'সাংস্কৃতিক জোট' গড়লেন। ঢাকার এবং ঢাকার বাইরের সচেতন শিল্পী সংগঠকদের নিয়ে প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক একটি জোট গঠন করলেন। নাম দিলেন 'বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা'। লোহানী ভাইয়ের সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিবেদিত ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য, মানবিকতা বিকাশের জন্য এবং একটি অসাম্প্রদায়িক আলোকিত সমাজ গড়ার জন্য, যা তিনি লালন করেছেন, ধারণ করেছেন, চর্চা করেছেন সারাজীবন।

কামাল লোহানীর ব্যক্তিত্বের মাত্রা বিশাল বিপুল। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন সাংবাদিক। মিল্লাত, আজাদ, দৈনিক পূর্বদেশ ইত্যাদি পত্রিকায় স্বাধীনতার আগে কাজ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর '৭২ সালে বাংলাদেশ বেতারের প্রথম পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর আবার সাংবাদিকতা পেশায় ফিরে আসেন। পরবর্তী সময়ে প্রেস ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন নিরন্তর। সাংবাদিক ইউনিয়নে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

কামাল লোহানী কোনো রাজনৈতিক দলে ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শে একজন যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। জাতীয় রাজনীতির চলমান ধারায় সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধান বাস্তবায়নের জন্য প্রবীণ বয়সেও সংগ্রাম করেছেন। দেশ, সংস্কৃতি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশ কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। লোহানী ভাইকে অনেকেই তাগাদা দিয়েছিলেন স্মৃতিকথা লেখার জন্য। একেবারে শেষ বয়সে লেখা শুরু করলেন। তখন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গেছে। শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে লেখা শুরু করলেন। ষাটের দশক পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি সমাপ্ত করতে পেরেছিলেন। এখন এটি প্রকাশনার পথে।

আমরা যদি '৭১-এর পথে হাঁটতে চাই, তাহলে কামাল লোহানীর কাছে যেতে হবে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি রাজপথে থেকেছেন। তারপর চলে গেলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। লোহানী ভাই রচিত 'মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন- 'যৌবনে রাজপথে স্লোগানে উচ্চকিত কণ্ঠ শহীদ মিনারে কি পল্টন ময়দানে কি টঙ্গীর শ্রমিকাঞ্চলে অথবা নওগাঁর ঈদগাহ ময়দানে, সিলেটে কুলাউড়ার কৃষক সম্মেলনে, চট্টগ্রামের জাম্বুরি মাঠে- এমন কত না কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতার সমাবেশে ধারাভাষ্য পাঠের বলিষ্ঠতায় যে কণ্ঠকে নিরন্তর কাজে লাগিয়েছিলাম- আমার এই কণ্ঠ এখন দেশের মুক্তিসংগ্রামের কাজে লাগাতে চাই। স্লোগান দেওয়া এই কণ্ঠকে আজ শত্রুর বিরুদ্ধে মুক্তির যুদ্ধে লাগাতে চাই।'

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের দিনে তেজগাঁও বিমানবন্দরে ও কলকাতায় প্যারেড গ্রাউন্ডে সরাসরি সম্প্রচারিত ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন লোহানী ভাই। তার শুদ্ধ উচ্চারণ, বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর উপস্থিত বক্তব্য, তীক্ষষ্ট শব্দচয়ন সমগ্র পরিবেশকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। তিনি তার আদর্শ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। আমৃত্যু তিনি চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থেকেছেন। খুবই বিস্ময়ের সঙ্গে যখন জানলাম লোহানী ভাই একুশে পদক পেয়েছেন, কিন্তু স্বাধীনতা পদক পাননি- তখন আমার শুধু মনে হয়েছে এ গ্লানি আপনার, আমার, জাতির এবং রাষ্ট্রের। লোহানী ভাই আলোর পথযাত্রী। তার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে সমাজ। ঋদ্ধ হয়েছে মানবমন। অনুপ্রাণিত হয়েছি আমরা সবাই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে স্মরণ করতে হবে। লোহানী ভাইকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণে বলতে চাই-'কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ/জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।'

আবৃত্তিকার; অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

আরও পড়ুন

×