ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিডও দিবস

করোনাকালে বিপন্ন নারীর মানবাধিকার

করোনাকালে বিপন্ন নারীর মানবাধিকার
×

রঞ্জন কর্মকার

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০

নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে অন্যান্য আর্থ-সামাজিক বিষয়ের পাশাপাশি নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সরকারের আমলে রচিত হয় আমাদের জাতীয় সংবিধান, যার বিবিধ ধারার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাঠামোতে নারী-পুরুষ সাম্য, সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ অন্য সব অর্জনের পাশাপাশি নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক স্থানে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন তথ্যসূত্র এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির বাস্তবায়ন, জাতিসংঘ সিডও সনদের বাস্তবায়ন, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন, বৈষম্যমূলক আইন পরিবর্তন করে নারীবান্ধব আইনকানুন চালু, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নারীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনার প্রচেষ্টা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং জেন্ডার টার্গেট স্থির করা ইত্যাদি ইতিবাচক উদ্যোগ নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতি লক্ষণীয়। মানব উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উন্নতি ঈর্ষণীয়। এর নেপথ্যে রয়েছে বর্তমান সরকারের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থান, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনামূলক কর্মসূচি; বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড; সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের উঠে আসার গল্প; তৈরি পোশাকশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের দৃপ্ত পদচারণা।
কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরের পর থেকে ভয়াল করোনাভাইরাসের থাবায় স্থবির সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি নারী-পুরুষের সম্মিলিত অর্জনগুলো থমকে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা করোনা মহামারিকালে বেড়েছে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা; হুমকির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা, কারখানা কর্মীসহ কর্মজীবী নারীদের জীবন ও জীবিকা; সংকটে পড়েছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য-শিক্ষা-স্বাবলম্বী হওয়ার সম্ভাবনা, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সম্ভাবনা এবং বেড়েছে বাল্যবিয়ে। সংকুচিত হয়ে পড়েছে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ। সর্বোপরি নারীর এতদিনের সংগ্রামে অর্জিত সাফল্যগুলো ম্লান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে যুগ যুগ ধরে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জাতিসংঘ নারীর প্রতি সব বৈষম্য বিলোপ এবং নারী-পুরুষের বিভেদ রদ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও সনদ গৃহীত হয় এবং ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এটি কার্যকর করা শুরু হয়। এ জন্য ৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিডও দিবস হিসেবে পালন করা হয়। সিডও সনদকে বলা হয় নারীর অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক দলিল। বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি ধারায় আপত্তি বা সংরক্ষণসহ ১৯৮৪ সালে সিডও সনদ স্বাক্ষর করেছে এবং এটি বাস্তবায়নে বারবার তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। সিডও কমিটি সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন, বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়ন, নারীর উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা, জনবল, কারিগরি ও আর্থিক সম্পদ নিশ্চিত করা এবং বৈবাহিক ধর্ষণসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন প্রণয়নের জন্য তাগিদ দিয়েছে।

তবে সারাবিশ্বেই এখন যেখানে করোনার গ্রাস থেকে মানুষের জীবন এবং অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবল প্রয়াসে লিপ্ত, সেখানে নারীর ইস্যুগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে, তা নিয়ে সর্বত্রই খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। এখন অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। বর্তমান সময়ে নারীর নতুন চ্যালেঞ্জগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
যার ওপর ভিত্তি করে নারীর নতুন নতুন সংকটকে মোকাবিলা করার জন্য সরকার থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহযোগিতা পাবে।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২০ সালেই নারী উন্নয়নের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বেইজিং ঘোষণার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘের যে অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল, করোনার কারণে তা খুবই সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে, সিডও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে প্রতি চার বছর পর পর জাতিসংঘের সিডও কমিটির কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়, এ বছর নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সেটি জমা দেওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে তা খানিকটা অনিশ্চিত।
সরকারের দায়িত্ব হলো সিডও কমিটির সুপারিশ তথা সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে যথাসম্ভব উদ্যোগ নেওয়া। পাশাপাশি নাগরিক সমাজের কাজ হলো সিডও বাস্তবায়নে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করা এবং এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আমাদের দাবি হচ্ছে, অবিলম্বে সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করতে হবে এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।
করোনা একসময় হয়তো পৃথিবী থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর প্রভাবে নারী-পুরুষের সার্বিক উন্নয়ন-অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হলে এবং নারীর এতদিনের কষ্টার্জিত অর্জনগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেলে তা হবে এক অপূরণীয় ক্ষতি। এর কুফল আমাদের ভোগ করতে হবে যুগ যুগ ধরে। দেশে নারী-পুরুষ বৈষম্যের মূল উৎপাটন করে সমতা প্রতিষ্ঠায় সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তাই সব জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়েও সরকারকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ এখনও সিডওর মৌলিক জায়গাগুলোতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু এক দিন নিশ্চয়ই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হবে। সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সরকার ও বেসরকারি সংগঠন এবং জনমানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই ব্যক্তিগত এবং সাংগঠনিকভাবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেভাবে কাজ করলে এক দিন মানবিক মূল্যবোধ এবং সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন

×