ভূরাজনীতি
তিস্তার পানি কতটা তিতা
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২১ | ১৪:৫৪
তিস্তা দিয়ে বহু পানি গড়িয়েছে। কিন্তু রংপুরে ঢুকেই সেই পানি শুকিয়ে যায়। এই বঞ্চনা ৫০ বছর ধরে দেখছি। পাকিস্তান আমলেও হয়তো এ সমস্যা ছিল। বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধান হয়নি। মাঝখানে জেনারেল জিয়া, সাত্তার, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার শাসনামল গেছে নানান টালবাহানার মেঘে ঢাকা অবস্থায়। এখন আর দেশবাসী এ নিয়ে শঙ্কিত নয়। কারণ তারা জেনে গেছে- তিস্তার পানি তিতা।
ভাটির দেশ বলে আমাদের উদ্বেগ বেশি। আমাদের জনসংখ্যাও বেশি ভূমির তুলনায়। তাই ক্ষুদ্র দেশের সমস্যা-সংকট মেটাতে নিজেদেরই কিছু একটা চিন্তা করতে হবে। বড় বড় বিশেষজ্ঞ এ নিয়ে অনেক ভেবেছেন। শেষ পর্যন্ত শুনছি, ১০২ কিলোমিটার লম্বা বাংলাদেশ অংশের তিস্তা নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা হচ্ছে। ইউটিউবে আপলোড করা ব্যক্তিগত স্তরের বেশ কয়েকটি সচিত্র রিপোর্টিং শুনে আসছিলাম দুই বছর আগে থেকেই। তার একটি ছিল বিবিসি বাংলার সরেজমিন প্রতিবেদন। ভারত যেহেতু তিস্তার পানি দেবে না আমাদের, তাই নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হবে- কী করলে ওই নদীর পানির সংকট মোকাবিলা করা যায়।
এ নদীর প্রধান সমস্যা নাব্যহীনতা। এর প্রধান কারণ, উজানে তিস্তার ওপর কয়েক জায়গায় ড্যাম, ব্যারাজ, টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। বিবিসি বাংলার প্রবাহ অনুষ্ঠানে দুই বছর আগে দেখানো হলো ভারত কোথায় কোথায় ব্যারাজ, ড্যাম আর ক্যানেল কেটে পানি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কম যান না। একটি আন্তর্জাতিক নদীর পানিপ্রবাহের মালিক সেসব দেশ, যাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে নদীটি। তিস্তার উৎস সিকিম রাজ্য। পানি তাই ভারত ও বাংলাদেশের সমান সমান পাওয়ার কথা। যেমনটা পাওয়ার কথা পদ্মা নদীর পানি। এ দুটি নদীর উজান থেকেই পানি শোষণ করে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কায়দায়। এসব কায়দা বাংলাদেশের জানা। তবে সে পথে বাংলাদেশ যেতে পারেনি। সরকার ওই পথে সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। তাই কি দ্বিতীয় পথ?
বলা হচ্ছে, 'তিস্তা রিভার কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট রেস্টোরেশন প্রজেক্ট' নামে একটি সম্ভাব্যতা এরই মধ্যে যাচাই করা হয়ে গেছে। ১০৬ কিলোমিটার লম্বা বাংলাদেশ অংশকে তিনটি ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সুবিধা হয়। এ জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে এক বিলিয়ন ডলার বা ৮ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। কী কী হবে সেখানে? রংপুরে, যেখানে তিস্তা বাংলাদেশে ঢুকেছে সেই পয়েন্ট থেকে মহিপুর পয়েন্ট পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটার; মহিপুর থেকে কাউনিয়া ব্রিজ পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার ও কাউনিয়া থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটার- এই তিন ভাগে তিস্তা নদীর চ্যানেল ড্রেজিং করে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যাতে ১০০ মিটার সরু করে আনা সম্ভব হয় নদীর মেইন স্ট্রিম পানির প্রবাহ। গ্রোয়েন, লেভি ও ক্রসবার তৈরি করে প্রবাহ চ্যানেল ঠিক করে উদ্ধার করা হবে ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি। পলি, বালু জমে থাকা সেই হারানো ভূমি উদ্ধার হবে। নদীর দুই পাড়ে ২২০ কিলোমিটার মেরিন বাঁধ নির্মাণ করে গড়ে তোলা হবে পর্যটনসহ উৎপাদনশীল কর্মমুখী উন্নয়ন প্রকল্প। তাতে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। ফসলি জমিতে ফলানো হবে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য। সব মিলিয়ে এ স্বপ্ন যদি সত্যই বাস্তবায়নের পথে অচিরেই আসতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ বেঁচে যাবে তিস্তার পানি নিয়ে বিদ্যমান সংকট থেকে। বেঁচে যাবে অকালবন্যার হাত থেকে এবং প্রতি বছর যে লাখ লাখ কোটি টাকার ফসল ও সহায়-সম্পদের ক্ষতি হয়; বাস্তুচ্যুত হয় গরিব সাধারণ মানুষ; তারও হবে অবসান।
তিস্তা বেসিনের জন্য পরিকল্পিত এই স্বাপ্নিক প্রকল্প যদি সত্য সত্যই বাস্তবায়নের ট্র্যাকে উঠে আসে, তাহলে এ কথা আমরা বলতে পারি, অদূর ভবিষ্যতে রংপুর, গাইবান্ধাসহ ওই নদীর অববাহিকার জনজীবনে লাগবে উন্নয়ন ও কর্মযজ্ঞের কাঙ্ক্ষিত প্রবাহ।
স্বপ্ন দেখতে না জানলে তা বাস্তবায়নেরও কোনো সম্ভাবনা থাকে না। তিস্তা নিয়ে একটি বাস্তবমুখী স্বপ্ন রচিত হয়েছে বলেই প্রতীয়মান। তবে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন খুবই ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি। তিস্তা প্রকল্পের অববাহিকা উন্নয়নে কমপক্ষে ২০-২৫ বছরের পরিকল্পনা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগও। বলা হচ্ছে, এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান। টেকনিক্যাল সাপোর্টও দেবে চীন। চীনের সর্বাত্মক আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার এ প্রণোদনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ভারতের মনে এক ধরনের শঙ্কা জেগেছে বলে মনে হচ্ছে। তাদেরও কয়েকটি ভিডিও বিশ্নেষণ আমি শুনেছি। তারা ধারণা করছে, এ প্রকল্পে চীন সার্বিক সাহায্য ও সমর্থন দিচ্ছে তাদেরও অকথিত লক্ষ্য সামনে রেখে। ভারত মনে করে, চীন তিস্তা নদীর ওই প্রকল্পের সুবাদে বাংলাদেশে প্রভাব বাড়িয়ে নিতে পারে।
তিস্তার পানি কেন তিতা- তা কি বোঝা গেল? এগুলো কেবল দুই দেশের রাজনৈতিক ও ভূ-সামরিক পরিস্থিতিগত বিরোধের যৎসামান্য। অন্তর্গত রয়ে গেছে আরও বহু স্তরের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। এ কারণেই ৫০ বছরের বঞ্চনার পর বাংলাদেশ যখন এ পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বোঝা যায়, দেশ ও জনগণের স্বার্থ সরকার হৃদয় দিয়ে অনুভব করছে।
আমরা শান্তিপ্রিয়। যে কোনো রকম আঞ্চলিক বিরোধের বিরোধী আমরা। সহাবস্থান ও সৎপ্রতিবেশীসুলভ লেনদেন করাই ভালো। কোনোভাবেই দাদাগিরি ভালো চোখে দেখে না এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ। সরকার সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সমমর্যাদার ভিত্তিতে সহাবস্থানে বিশ্বাসী। ভারত ও চীন- দুটি দেশই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র এবং আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। আমরা এর কোনোটিকেই হারাতে চাই না দেশের বৃহত্তর স্বার্থে।
বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। চিন্তা করে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করুক সরকার- এ প্রত্যাশাই করছি আমরা।
সাংবাদিক
- বিষয় :
- ভূরাজনীতি
- ড. মাহবুব হাসান