ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

'শক্তিশালী' বিএনপির ভেতর-বাহির

'শক্তিশালী' বিএনপির ভেতর-বাহির
×

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২১ | ১২:০০

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছেন, তাদের দল বর্তমানে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। গত ২৭ জুন দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তিনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে কোনো সময়ের চেয়ে বিএনপি এখন ঐক্যবদ্ধ। অতীতে যা ছিল, তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।' সংবাদমাধ্যমে বিএনপিকে নিয়ে কিছু খবর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'বিএনপির বিরুদ্ধে যারা লিখছেন, তারা নিঃসন্দেহে ভুল তথ্য থেকে লিখছেন, বিভ্রান্ত হয়ে লেখেন, জনগণকে বিভ্রান্ত করেন' (সমকাল, ২৮ জুন, ২০২১)।
বিএনপি মহাসচিব কথাগুলো বলার সময় হয়তো খেয়াল করেননি যে, তারেক রহমানের নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি প্রকারান্তরে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং বর্তমান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেছেন। কেননা, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী বলার অর্থই হলো জিয়া-খালেদার সময়ে দলটি এর চেয়ে দুর্বল ছিল বোঝানো। তবে, রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ তেতাল্লিশ বছর সময়ের মধ্যে বিএনপি বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে। দলটির ভেতরে অনৈক্য ও দ্বন্দ্ব-কোন্দল দুরারোগ্য ব্যাধির রূপ নিয়েছে। কেউ কেউ বলতে পারেন, বিএনপি দুর্বল হলো কি সবল হলো তাতে আমাদের এত ভাবনা কেন? এর জবাব একটাই- দেশে অর্থবহ গণতান্ত্রিক রাজনীতি কার্যকর করতে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান অত্যন্ত প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপিকে নিয়ে যেসব খবরাখবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তার বেশিরভাগই হতাশাব্যঞ্জক। দলের অভ্যন্তরে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতানৈক্য, বিভেদ-কোন্দল, একে অন্যকে ল্যাং মারার চেষ্টা, কমিটি-বাণিজ্য, দায়িত্বপ্রাপ্তদের স্বজনপ্রীতি, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে 'মাই ম্যান' খোঁজা এবং পদ বণ্টনে আর্থিক লেনদেনসহ যেসব খবর দৃষ্টিগোচর হয়, তা কি একটি ঐক্যবদ্ধ বা শক্তিশালী দলের পরিচয় বহন করে? প্রতিটি জেলা-উপজেলায় দলটি কোন্দলে জর্জরিত। এমন কোনো জেলা-উপজেলা নেই, যেখানে দুই বা ততাধিক গ্রুপের অস্তিত্ব নেই। ফলে ওইসব জেলা-উপজেলায় কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে পালন করতে পারে না। কমিটি গঠন নিয়ে চলে নানা রকম খেলা।
বিএনপি যদি বর্তমানে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালীই হবে, তাহলে মহাসচিব মির্জা আলমগীর কেন নেতাকর্মীদের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ দিলেন? গত ১২ জুন অনুষ্ঠিত একটি ভার্চুয়াল অলোচনা সভায় তিনি বলেছেন, "সরকার পতনের আন্দোলন শুরুর আগে অতিদ্রুত দলের অভ্যন্তরীণ 'বিভেদ-গ্রুপিং' দূর করতে হবে" (সমকাল, ১৩ জুন, ২০২১)। পনেরো দিন আগে তিনি 'বিভেদ-গ্রুপিং' দূর করার আহ্বান জানালেন, আর পনেরো দিন পরে বললেন দল অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ! কীভাবে সম্ভব এটা? তাহলে কি এই পনেরো দিনের মধ্যে বিএনপি এমন কোনো ভেষজ বটিকা সেবন করেছে, যে কারণে তার শরীরে নবশক্তির সঞ্চার হয়েছে? এটা প্রমাণিত যে, রাজনীতিকরা বেশিরভাগ সময় সত্যকে স্বীকার করতে চান না বা ঢেকে রাখতে চান। এতে প্রকৃত ঘটনার কোনো হেরফের হয় না, তবে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। বিএনপির সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা বা কোন্দেলের বিষয়টি এখন আর লুকোছাপার বিষয় নয়। ভুল রাজনীতির কারণে তারা বারবার হোঁচট খাচ্ছে, উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেও পারছে না। কেন পারছে না, সেটা একটা প্রশ্ন। অস্বীকার করা যাবে না, সরকারের বাধার কারণে তারা অনেক কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে বাধা কোথায়? বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৯। বর্তমানে তাতে পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতেও প্রায় অর্ধশত পদ খালি। এসব পদ পূরণের কোনো উদ্যোগ নেই। কেন নেই এ প্রশ্নেরও কোনো সদুত্তর নেই। দলটির নেতাদের অভিযোগ- দলে অনেক যোগ্য নেতা 'বেকার' বসে থাকা সত্ত্বেও ওই পদগুলো পূরণ করা হচ্ছে না।
২৪ জুন একটি দৈনিকে 'এক যুগ ধরে কমিটিজটে বিএনপি' শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পর বিএনপি অধিকাংশ সাংগঠনিক জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি। কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও সফলতা আসেনি। ২০১৯-২০ সালে তারেক রহমান উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। পুরোনো কমিটি ভেঙে ৩৭ জেলায় আহ্বায়ক কমিটি করে তাদের তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশ দেওয়া হলেও দুই-চারটি ছাড়া সবগুলোতেই ব্যর্থ হন তারা। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিজস্ব বলয়ের নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দেওয়া নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব-কোন্দলই মূল কারণ। এ নিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভও হয়েছে। কোথাও কোথাও হয়েছে সংঘর্ষও। ছাত্রদল, যুবদল স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির ১১টি সহযোগী সংগঠনে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। ছাত্রদল বাদে সবগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিই মেয়াদ উত্তীর্ণ।
এদিকে সম্প্রতি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন কেন্দ্রীয় নেতা কর্নেল মো. শাহজাহান (অব.) ও মেজর মোহাম্মদ হানিফ (অব.)। আর ৭ জুলাই এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (অব.) তার মনঃকষ্ট ব্যক্ত করে বলেছেন, চরম অস্বস্তি নিয়ে তিনি এখনও কোনোমতে বিএনপিতে টিকে আছেন। এসব ঘটনা বা খবর নিশ্চয়ই দলটির ঐক্যবদ্ধতা বা শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ বহন করে না।
বিএনপির 'থিঙ্ক ট্যাঙ্ক' হিসেবে পরিচিত গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্প্রতি একটি পত্রিকাকে বলেছেন, 'বিএনপি অযৌক্তিক ধারণা নিয়ে বসে আছে। তারা না আছে মাঠে, না আছে তাদের কোনো কৌশল। ওদের মস্তিস্ক স্থবির হয়ে গেছে। এরা কোনো চেষ্টাই করছে না। এমনকি তাদের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নেও। তারেক রহমান মনে করেন, 'কেউ না কেউ তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে।' এ মন্তব্য প্রকাশের দুই দিন পরেই এর 'প্রতিক্রিয়া' টের পেয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গোলটেবিল আলোচনায় ছাত্রদলের এক জুনিয়র কর্মীর কাছ থেকে ধমকি ও হুমকি 'উপহার' পেয়েছেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির একজন শুভানুধ্যায়ী সন্দেহ নেই। তিনি তার অবস্থান থেকে দলটিকে বিভিন্ন সময়ে নানা পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। সেদিন প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানেও তিনি একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথাগুলো বলেছিলেন। কিন্তু বিএনপি বুঝল উল্টোটা। তারা কী ভেবে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে অমন একটি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলল তা অনেকেরই বোধের অগম্য।
কয়েক বছর আগে বিএনপি সমর্থক একজন সিনিয়র সাবেক আমলা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দলটিকে নিয়ে একটি মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, 'বিএনপি অনেক কাজই হয়তো ঠিকমতো করতে পারে না। তবে একটি কাজ খুব ভালোভাবে করতে পারে; যে কাজটি বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর অন্য কোনো রাজনৈতিক দল অত ভালোভাবে করতে পারে বলে আমার জানা নেই। সে কাজটি হলো- 'বন্ধুকে শত্রু বানানো'।
সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×