ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদিবাসী দিবস

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার এবং সামাজিক অঙ্গীকার

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার এবং সামাজিক অঙ্গীকার
×

আন্না মিন্‌জ

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১৫:০৭

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৯ সালের ২৩ মার্চ বাংলাদেশ গেজেটে জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দেশে ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে। যদিও এর সংখ্যা আরও বেশি বলে এসব জাতিগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ দাবি করে থাকেন। এই জাতিগোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি, জীবন-জীবিকা বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশের কম। বলা চলে গত ১০ বছরে এই জনসংখ্যা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ সমতলে ও ২০ শতাংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে।

পাবর্ত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় সংসদে নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও ময়মনসিংহ-১ আসনের সাংসদ ব্যতীত সমতলে আর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে সমতলের নৃগোষ্ঠীগুলো সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এখনও সমতলের প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন।

সর্বজনীন উন্নয়ন নীতিমালার বাস্তবায়নে এসব জাতিগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে গুরুত্ব না দেওয়া, পৃথক ভূমি কমিশন ও মন্ত্রণালয়ের অনুপস্থিতি, স্থানীয় সরকার কাঠামোতে প্রতিনিধিত্ব না থাকা ও আদিবাসীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক ভাতা পৃথকভাবে বরাদ্দ না থাকায় বিভিন্ন সেবা থেকে তারা বঞ্চিত। সীমিত পরিসরে যেসব পরিকল্পনা রয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়নেও দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বেশিরভাগ মানুষই দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। কভিড-১৯-এর ফলে তারা চরমভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাদের অনেকের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২০ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে উলেল্গখ করা হয়, চলমান মহামারিতে সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শতকরা ৭০ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। অধিকন্তু এ সময়েও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের প্রতি সহিংসতা থেমে নেই। বেসরকারি সংস্থা ক্যাপেং ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণায় উলেল্গখ করা হয়েছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে ১৩ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী ধর্ষণ, অপহরণসহ গুরুতর সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যাদের ৯ জনই সমতলের। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করার দরুন এ ধরনের সহিংসতার অনেক ঘটনার তথ্যই গণমাধ্যম পর্যন্ত উঠে আসে না। ফলে এসব সহিংসতার ঘটনা প্রকৃতপক্ষে আরও বেশি হতে পারে।

ব্র্যাক সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি (আইডিপি) পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ২০১২ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৮৩,৮০০ অংশগ্রহণকারীকে কভিড-১৯ স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সামাজিক সচেতনতা বার্তা প্রদান করেছে। চলমান সেবাগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে ৩,১৯৪ অতিদরিদ্র পরিবারকে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন স্থাপনে সহায়তা ও ব্যবহার নিশ্চিত, ৪১৮৮ পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণের পর তাদের আয় বৃদ্ধির জন্য চাহিদামাফিক সম্পদ হস্তান্তর, যুবসমাজের জন্য ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান।

কভিড পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য আইডিপি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা, মহাদেবপুর, পোরশা ও নিয়ামতপুর উপজেলা; জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলা ও দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ ও হাকিমপুর উপজেলায় মাঠকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাঁওতাল ও ওঁরাও (সাদ্রি) ভাষায় সচেতনতা বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। এ ছাড়া ২০২০ ও ২০২১ সালে কর্ম-এলাকার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র ৪,৯০০ পরিবারের মধ্যে দুই সপ্তাহের জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়।

সার্বিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি, আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক সব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। ২০২১-২২ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেটে 'উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ' দেওয়া হয়েছে সর্বমোট ১,১৮২ কোটি টাকা। সমতলের আদিবাসীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আনুপাতিক হারের পরিপ্রেক্ষিতে এই বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। অধিকন্তু, সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রসহ সমাজের সব জনগণকে হতে হবে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য পৃথক ভূমি কমিশন, কর্মমুখী শিক্ষা ও করোনাকালে চাকরি বা কাজ হারানোদের জন্য বিশেষ সহায়তা ও কর্মসংস্থান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কভিড সংক্রমণ কমাতে ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নিতে হবে সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম অঙ্গীকার অনুযায়ী কোনো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী উন্নয়নের ধারা থেকে যেন পেছনে না পড়ে সেজন্য সরকার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং দাতাগোষ্ঠীর সমন্বিত অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে সমতল ও পাবর্ত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সার্বিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সামাজিক অঙ্গীকার করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীসহ বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করার এখনই সময়।

পরিচালক, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি, ব্র্যাক

আরও পড়ুন

×