আদিবাসী দিবস
দরকার নয়া সংযোগ, নয়া সংহতি
পাভেল পার্থ
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১৫:০৬
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ভিত্তি সুরের সঙ্গে মিল রেখে করোনাকালের বিশ্ব আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ- 'কাউকে পেছনে ফেলে নয়, আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে, দরকার এক নয়া সামাজিক সংযোগ ও সংহতি'। কী সেই সামাজিক সংযোগ বা সংহতি? কার সঙ্গে কার?
যদি বাংলাদেশের কথাই ধরি তবে ১৭ কোটি মানুষের দেশে আদিবাসী মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সংখ্যায় নগণ্য, নড়বড়ে বসতি, ক্ষুুধায় কাতর, কার্যত ভূমিহীন আর গরিব দিনমজুর এই মানুষেরা কেন বারবার দুনিয়ায় 'উদাহরণ' আর 'মনোযোগ' হয়ে ওঠেন? কী অবদান এই নিরন্ন ও ভূমি হারানো মানুষদের? যতবার দুনিয়া বিপদে পড়েছে, সামাল দিয়েছে উত্তাল সংকট, ততবার দুনিয়া একটু হলেও স্মরণ করেছে এই সব হারানো মানুষদের। এমনকি চলমান করোনা মহামারিকালে আবারও দুনিয়া স্মরণ করেছে আদিবাসী মানুষদের। আদিবাসী মানুষের জ্ঞান, কারিগরি, দর্শন আর জীবনবোধের।
আদিবাসী মানুষ দুনিয়ার সঙ্গে কোনো ছলনা করেনি। এই মাতৃ-দুনিয়াকে চুরমার করে, দুমড়েমুচড়ে দোকানে তোলেনি। এখানকার জল, মাটি, অরণ্য, পাহাড়, বাতাস কী জীবকুল- সবকিছুর সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চেয়েছে। সহস্র বছর ধরে দুনিয়াকে একটা জগৎ-সংসার বলেই চিন্তা করেছে। যার কোনো মালিকানা নিজে দাবি করেনি কোনো দিন, সন্তানকেও এই শিক্ষাই দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বুঝতে পারেনি দুনিয়ায় ভূগোল, ইতিহাস, অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ভিন্ন ভিন্ন হয়। একটা পাহাড় কি বড় নদী কখনও দুই টুকরো হয়ে যায়, পাহাড় আর নদীর নাম বদলে তখন হয় 'রাষ্ট্র'।
হয়তো আদিবাসী মানুষ নিজেদের বহুজাতিক বাজারের চৌকস ভোক্তায় পরিণত করতে পারেনি বা নয়া উদারবাদী ব্যবস্থায় নিজেদের জান-জবান বিলাতে পারেনি। আর হয়তো তাই এমন মানুষেরা অধিপতি উন্নয়নের মাপকাঠিতে 'পিছিয়ে আছে'। আচ্ছা যদি একটু উল্টো করে দেখা যায়- আদিবাসী জগৎ যে দর্শন ও জীবনবোধ ধারণ করে, তা যে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত, সেটিই 'পিছিয়ে থাকা উন্নয়ন'।
পেছন থেকে কাউকে সামনে আনতে হলে কেবল কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী নয়, তার সামগ্রিক জীবনবোধ আর চিন্তাদর্শনকে সামনে আনা জরুরি। কারণ স্বকীয় জীবনবোধ আর আত্মপরিচয়ের জটিল সীমানাই আদিবাসী মানুষের সত্যিকারের উপস্থিতি। আর এ কারণে আজ আদিবাসী সমাজ ও বৃহত্তর জনসমাজের ভেতর দরকার এক নয়া সৃজনশীল সংযোগ, দরকার এক সংবেদনশীল সংহতি।
আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। আদমপুর রেঞ্জের কাউয়ারগলা বিটে গহিন বনের ভেতর একটা ছোট্ট খাসি পুঞ্জি আছে। নাম কালেঞ্জি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ সীমান্তে পড়েছে। ছড়ার পাড়ে উঁচু সব বৃক্ষ-ফার্ন আর নানা জাতের কচুর ঝোপ। কেমন এক মায়াময় বর্ষারণ্যের পরিবেশ। কালেঞ্জি পুঞ্জির নসিফ পথমির কাছে আমার যেদিন 'খাসি উদ্ভিদবিদ্যা'র হাতেখড়ি হয়, আমি নসিফের ঘরে ঢুকে বেহুঁশ হয়ে যাই। চারধারে ঝুলছে নানা লতাগুল্ম, ডাল, কন্দ, শিকড়, পাতা ও ফুল। নসিফের সঙ্গে সকালে বের হই, বন-বাদাড় ঘুরে বিকেল নাগাদ পুঞ্জিতে ফিরি। একদিন কিছুটা বৃষ্টি হয়েছিল, দুপুর বা মধ্য বিকেলে এক চকচকে পাতার কচু নিয়ে নসিফের সঙ্গে তর্ক হয়। খাসি ভাষায় এর নাম 'নিয়াংসোয়াত'। এই কচুর যে উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় আমি জানি, নসিফ জানান এটি সেটি নয়। পরের সকালে নসিফ আমার বলা কচুটিও খুঁজে আনেন। আমি দুটি কচুর ভেতর কোনো অমিল খুঁজে পাই না। নসিফ আমাকে কচু দুটি শনাক্তকরণে এক গোপন শ্রেণীকরণ জ্ঞানদান করেন। আমার মুখের হাঁ বন্ধ হয় না। নমুনাসমেত ঢাকায় ফিরে ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে যাই। ড. হোসনে আরা বেগম তখন কচু বিষয়ে পিএইচডি করছেন। তিনিও কচু দুটিকে প্রথমে একই প্রজাতির হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে আমি নসিফের বিবরণটি বলি। বেশ সময় নিয়ে বহু নিরীক্ষার পর প্রমাণিত হয় নিয়াংসোয়াত আসলেই একটি আলাদা কচুর জাত। বাংলাদেশে যা প্রথম নতুনভাবে শনাক্ত হয় এবং এ বিষয়ে গবেষণাপ্রবন্ধও প্রকাশিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালীন আগ্রাসী একাশিয়া আর বাঁশঝাড়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়ে একটা সমীক্ষা করেছিলাম। দেখেছিলাম একাশিয়ার মতো আগ্রাসী গাছের তলায় কিছুই জন্মায় না। পরে দেশ ঘুরে আগ্রাসী গাছের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষগুলো জানতে পারি। কিন্তু নেত্রকোনার দুর্গাপুরের মেঘালয় পাহাড়ের তলায় মেনকীফান্দা গ্রামের এক টিলায় শিক্ষক অজিত রিছিলের সঙ্গে সাক্ষাতের পর একদম থ হয়ে যাই। আগ্রাসী গাছের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই মানুষটি জেল-জুলম সহ্য করেছেন। বন বিভাগ প্রাকৃতিক শালবন উপড়ে একাশিয়া চারা লাগিয়েছিল। অজিত রিছিল একাশিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। আগ্রাসী গাছের বিরুদ্ধে মেনকীফান্দা আন্দোলন আমাকে স্থানীয় বৃক্ষ প্রজাতির বাস্তুতন্ত্র এবং এর সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের জটিল বিন্যাসগুলো বুঝতে সহায়তা করেছে।
বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে আমার জুমচাষ শেখার শিক্ষক ছিলেন মূলত মধ্যবয়সীরা। শতবর্ষী সেকরে ম্রোর সঙ্গে পরিচয় ঘটে পরে। জুম থেকে ফিরে সন্ধ্যায় এমপুপাড়াতে আসর জমতো, সেকরে ছিলেন তার মধ্যমণি। দুনিয়ায় নানারকম বর্ষপঞ্জিকা হয় জানতাম। কিন্তু এক এক পোকার ডাক ও উপস্থিতি দিয়েও ঋতু ও মাস বুঝতে পারার মতো পতঙ্গ-পঞ্জিকার কথা যখন সেকরে জানান, তখন থ হয়ে যাই। এক পোকা ডাকল জুমে বীজ বুনতে হয়। আবার আরেক পোকা ডাকলে ফসল তোলার সময়। সেকরে ম্রো থেকেই শিখেছিলাম প্রকৃতির সংকেত ও নির্দেশনাগুলো বুঝলে আদতে একটা জীবনচক্র আন্দাজ করা যায়।
এমন সহস্রজনের সঙ্গে আমার অবিস্মরণীয় সময় কেটেছে। শিখেছি প্রাণ-প্রকৃতির অনন্য ব্যাকরণ। বুঝেছি মাতৃ-দুনিয়ার টিকে থাকার শর্ত। এই মানুষেরা যেভাবে পৃথিবীকে দেখেছেন, যেভাবে জীবনকে আন্দাজ করেছেন- এই পৃথিবী কি সেই ধারাপাত মানছে? ক্ষমতা আর নয়া উদারবাদী বাজার কী বলে? তাহলে 'কাউকে পেছনে না রেখে' যদি সবাইকে নিয়ে সমানতালে উন্নয়নের ময়দান আমরা দেখতে চাই, সেখানে এই মানুষদের জীবনবীক্ষা আর দর্শন কোথায় থাকবে?
উন্নয়নযাত্রার পেছনে না সঙ্গে- প্রশ্নটি আজ সবার জন্যই উন্মুক্ত রইল। অনেকেই বলবেন হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহ, উলগুলান, তেভাগা, নানকা, হাতিখেদা, টঙ্ক, ভানুবিল, চা বাগানের হাতবন্ধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকবিরোধী সংগ্রাম- সবখানেই আদিবাসী-বাঙালির শ্রেণিগত ঐক্য গড়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধে গড়ে উঠেছিল দুর্বার সংহতি। কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে ইকোপার্কবিরোধী লড়াই বা ফুলবাড়ী কয়লা খনিবিরোধী আন্দোলনেও আমরা আদিবাসী ও বাঙালির মিশ্র অংশগ্রহণ দেখি। কিন্তু এসব সংযোগ আর সংহতির গভীরেও যেন রয়ে গেছে ঔপনিবেশিকতার এক নিদারুণ দেয়াল। এই দৃশ্যমান কি অদৃশ্য বা ঝাপসা বা আড়াল করে রাখা দেয়াল চুরমার করে তলিয়ে দেওয়া জরুরি?
আদিবাসী জীবনের সমৃদ্ধ জ্ঞানপ্রবাহ, বিজ্ঞান কারিগরি, প্রকৃতি সংরক্ষণবিদ্যা, পরিবেশগত অবদান, সৃষ্টিকর্ম, শিল্পকলা, দর্শন আর পরিশ্রমী ইতিহাসকে সম্মান, স্বীকৃতি আর সুরক্ষার ভেতর দিয়েই কেবল এক নয়া সৃজনশীল সংযোগ ও সংবেদনশীল সংহতি গড়ে উঠতে পারে।
প্রাবন্ধিক, গবেষক
- বিষয় :
- আদিবাসী দিবস
- পাভেল পার্থ