আদিবাসী দিবস
কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২১ | ১৫:০৫
আজ বিশ্ব আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক দিবস বা 'ইন্টারন্যাশনাল ডে অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইনডিজেনাস পিপলস' যাকে সংক্ষেপে 'আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস' বলা হয়। পৃথিবীর প্রায় ৯০টি দেশের ৪৭ কোটি ৬ লক্ষাধিক আদিবাসী মানুষের জন্য প্রতি বছর আগস্ট মাসের ৯ তারিখ একটি বিশেষ দিন হিসেবে বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ দিবস বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পালন করে। ১৯৮২ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘে আদিবাসী ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম উদ্বোধনী অধিবেশনের দিনটিকে স্মরণ করা জন্যই প্রতি বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করা হয়।
জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৬.২ শতাংশ আদিবাসী। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের রয়েছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, স্বতন্ত্র ভাষা, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্য। পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী রাখা, প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা করা এবং পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময় করে রাখার পেছনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে মৌলিক ভূমিকা। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পাস হয় 'আদিবাসীদের অধিকার সনদ', যেখানে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি আদিবাসীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। নানান আলোচনা, বহুমুখী তর্ক-বিতর্ক, এবং প্রায় দুই দশকাধিক সময়ের নানামুখী বিচার-বিশ্নেষণের ভেতর দিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৃহত্তর ফোরামে আদিবাসীদের অধিকার-সংক্রান্ত এ আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি করা হয়।
১৯৮২ সালে জাতিসংঘে প্রথম আদিবাসীবিষয়ক আলোচনা শুরু হলেও ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতি বছর আদিবাসী দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। তারপর ১৯৯৫ সাল থেকে ১০ বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে 'প্রথম আদিবাসী দশক' (১৯৯৫ সাল থেকে ২০০৪) ঘোষণা করা হয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সার্বিক অবস্থা, সমস্যা এবং সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে প্রথম আদিবাসী দশকের বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিশ্বের দেশে দেশে আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, তাদের ভূমি সমস্যার সমাধান করা, পরিবেশ রক্ষায় আদিবাসীদের নিজস্ব পদ্ধতিকে উৎসাহিত করা, আদিবাসীদের সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা, আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো ও আদিবাসীদের স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা দূরীকরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা।
২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আদিবাসীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় আদিবাসী দশকের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল আদিবাসীদের জীবনের নানান সম্পদের কার্যকর বা যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহার সুনিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোয় আদিবাসীদের সম্মানের জায়গা নিশ্চিতকরণের জন্য সামগ্রিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা। দ্বিতীয় আদিবাসী দশক চলাকালেই ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সুনিশ্চিতের লক্ষ্যকে সামনে রেখে 'আদিবাসী অধিকার সনদ' জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়।
আদিবাসী অধিকার সনদের বিরোধিতা করেছিল চারটি দেশ (আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড) ও ১১টি দেশ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিল এবং তন্মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ২০০৭ সালের পর প্রায় ১৪ বছর কেটে গেল বাংলাদেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হওয়া আদিবাসীদের অধিকার সনদে এখনও অনুস্বাক্ষর করেনি।
আমরা মনে করি, বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হওয়া আদিবাসী অধিকার সনদে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনুস্বাক্ষর করা জরুরি। এ কারণেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন শুধু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আদিবাসী জনগোষ্ঠী নানামুখী দুঃখ-দুর্দশা, বঞ্চনা এবং সমস্যার বয়ানও এ উৎসব উদযাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এখানে উল্লেখ করা জরুরি, প্রতি বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ একটি নির্দিষ্ট থিম বা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল প্রতিপাদ্যের বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- 'কাউকে পেছনে ফেলে নয় :আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও নতুন সামাজিক চুক্তির আহ্বান।' কিন্তু এ প্রতিপাদ্যের মর্মার্থ হচ্ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠী একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে জনতাত্ত্বিক বিবেচনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলেও তাদের পেছনে ফেলে মূলধারার সমাজ এগোতে পারে না। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে, সব ধরনের উন্নয়ন-উদ্যোগে, সব ধরনের উন্নয়ন মডেলে এবং কার্যকর উন্নয়ন রূপরেখায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় এ কথাই জোরালোভাবে উল্লেখ করা আছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কী ধরনের সামাজিক চুক্তির আহ্বান করা হয়েছে, তার একটি চমৎকার ব্যাখ্যা জাতিসংঘ এ বছরের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছে।
জাতিসংঘের ভাষায় 'সামাজিক চুক্তি' হচ্ছে এক ধরনের অলিখিত সম্মতি, যার মাধ্যম সমাজ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। জাতিসংঘ ব্যাখ্যা দিচ্ছে এভাবে, অনেক দেশে আদিবাসীদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, অনেক দেশে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষা সংকটের মুখে পড়েছে, অনেক দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমান্বয়ে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে এবং অনেক দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠী জাতি-রাষ্ট্রের কাঠামোয় এমনিতেই প্রান্তিক। এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আদিবাসীরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের সর্বগ্রাসী থাবার কারণে আদিবাসীর অনেকে চরমভাবে জীবন ও জীবিকার সংকটের মধ্যে পড়েছেন। তাই এ রকম একটি সামাজিক বাস্তবতায় বৃহত্তর সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে- আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী সমাজকে পেছনে ফেলে না রেখে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আর এটাই সামাজিক চুক্তি। জাতিসংঘের এ পর্যবেক্ষণ কি বাংলাদেশের জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য নয়?
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি আদিবাসী, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৮টি জেলায় অবস্থিত সমতলের আদিবাসী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের গারো আদিবাসী এবং সিলেট-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ অঞ্চলের আদিবাসী গোষ্ঠীর প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নানান সমস্যায় জর্জরিত। বিদ্যমান এসব সমস্যার পাশাপাশি করোনাভাইরাসের কারণে এসব পাহাড় এবং সমতলের আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকাও চরমভাবে সংকটের মুখে পড়েছে। আজ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের দিনে জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আমরা জাতিসংঘেরই নির্ধারিত প্রতিপাদ্যের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে আসুন একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তিতে সবাই অঙ্গীকারবদ্ধ হই- আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে নয়, বরং সঙ্গে নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া পরিকল্পনা করব। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটা হবে আরও একটি বড় অর্জন।
অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- আদিবাসী দিবস
- ড. রাহমান নাসির উদ্দিন