স্মরণ
তারকা সম্পাদক
×
গোলাম সারওয়ার (১৯৪৩-২০১৮)
রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০
সম্পাদক গোলাম সারওয়ার আর আমার পেশাগত সময়টা একই। দীর্ঘ সময় একসঙ্গে বিচরণ করেছি সাংবাদিকতার বিচিত্র জগতে। দেশে, দেশের বাইরে একসঙ্গে ঘুরেছি। অনেক তথ্য একসঙ্গে বসে পর্যালোচনা করেছি, বিশ্নেষণ করেছি। সাংবাদিকতার নানা দিক এবং ঘটমান নানা বিষয় নিয়ে বিতর্কও করেছি। আজ তিনি আমার কাছে জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায়ের অমলিন স্মৃতি। গত তিন বছর হলো তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু তিনি আছেন। আমরা যারা তার সহকর্মী ছিলাম, সাংবাদিকতায় তার আদর্শে অনুপ্রাণিত অসংখ্য উত্তরসূরি আছেন, অসংখ্য মানুষ যারা তার সংস্পর্শ পেয়েছেন, তার লেখায়-চিন্তায় সমৃদ্ধ হয়েছেন, তাদের কারও হৃদয়ে গোলাম সারওয়ারের মৃত্যু নেই।
তার ৭৫তম জন্মদিন এবং জীবনের শেষ জন্মদিন উপলক্ষে একটা লেখায় বলেছিলাম, 'সব পেশাতেই কিছু লোক থাকে, যারা নিজ নিজ অবস্থানে প্রজ্বলিত আলোকবর্তিকা। প্রতিষ্ঠানতুল্য এসব ব্যক্তিত্ব পেশাকে সমৃদ্ধ করেন তাদের মেধা আর প্রতিভা দিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের থেকেও বড় হয়ে ওঠেন ব্যক্তি। সাংবাদিকতা পেশার তেমনই এক ব্যক্তিত্ব গোলাম সারওয়ার।' আজ সেই নিজের কথাগুলোই আরও বেশি করে হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তার ক্ষুরধার লেখনী আর সৃজনশীলতার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধির যে শিখরে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই কথাটি আজ আরও বেশি করে বলতে ইচ্ছে করছে। কারণ সাংবাদিকতার আজকের চ্যালেঞ্জের সময়ে তার শূন্যতা বড় বেশি অনভূত হচ্ছে।
গোলাম সারওয়ারের সৃজনশীলতা আর মেধা তার সম্পাদিত প্রতিটি পত্রিকাতেই প্রস্ম্ফুটিত। ঐতিহ্যবাহী সাহসী সৃজনশীল সাংবাদিকতার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাকই তাকে নিয়ে এসেছিল পেশার শীর্ষস্থানে। যে প্রতিষ্ঠানকে গৌরবদীপ্ত করেছেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সিরাজুদ্দীন হোসেন আর আসফউদ্দৌলা রেজা। বার্তা সম্পাদক হিসেবে গোলাম সারওয়ার সেই ইত্তেফাককে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। করেছিলেন পাঠকনন্দিত এক সাহসী সংবাদ প্রতিষ্ঠান। তার প্রাঞ্জল ভাষাশৈলীর প্রবন্ধ, গভীর রাজনৈতিক বিশ্নেষণ আর সৃজনশীল নজরকাড়া সংবাদ পরিবেশন তাকে সাংবাদিকতা পেশার এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল।
পরবর্তী সময়ে যখন তিনি সম্পাদক হিসেবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দুটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রতিষ্ঠা করেন, সেগুলোতেও তার সৃজনশীলতা ও অসাধারণ দক্ষতার চমক দেখা গিয়েছিল। অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে গোলাম সারওয়ার বাজারভর্তি অনেক পত্রিকার মধ্যে 'যুগান্তর' আর 'সমকাল'কে পাঠকনন্দিত করে তুলেছিলেন। বাজারে আসার মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নবীন 'যুগান্তর'কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সম্পাদক হিসেবে তার সফলতা সম্পর্কে যারা সন্দিহান ছিলেন, তাদের ভুল প্রমাণিত করে দৃঢ় মনোবল আর আত্মবিশ্বাসে যুগান্তরকে ইত্তেফাকের সমপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এরপর সমকাল প্রতিষ্ঠা ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জেও তিনি ছিলেন শতভাগ সফল। সৃজনশীলতা, পেশাদারিত্ব আর নান্দনিকতায় সমকাল সুধী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই। একই সঙ্গে অসংকোচ প্রকাশে সাহসী সাংবাদিকতায় সংবাদপত্র জগতে অনন্য স্থান দখল করে সমকাল। দুরন্ত সাহসিকতার লক্ষ্য সমকালের এ যাত্রা এখনও বিরতিহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন ব্যক্তি তার সৃষ্টিশীল মেধার সঙ্গে সাহসিকতা যোগ করে যে কত বড় অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন- গোলাম সারওয়ার তা করে দেখিয়েছেন।
তার আমৃত্যু ধ্যান-জ্ঞান ছিল সাংবাদিকতা। জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। পেশার সমৃদ্ধি, গতিশীলতার জন্যই তিনি প্রতি মুহূর্তে ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে। অসংখ্য দক্ষ সাংবাদিক তৈরি করেছেন, হাতে-কলমে তাদের শিখিয়েছেন। সাংবাদিকতায় অনেক মেধাবী মুখের সমাবেশ ঘটেছে তার হাত ধরেই। তিনি শিখিয়েছেন পেশার নীতিবোধ এবং সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়া; কারও কাছে মাথা নত না করা পেশাগত দর্শন। তিনি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব সময় পেশাগত দৃঢ়তা বজায় রেখেছেন। সব সময় সত্যকে সত্য বলেছেন। কেউ তাকে দিয়ে কালোকে সাদা কিংবা সাদাকে কালো বলাতে পারেননি। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নেতাদেরও গোলাম সারওয়ার ছেড়ে কথা বলতেন না। তার কাছে যা সত্য আর যুক্তিযুক্ত মনে হতো, তিনি তা অসংকোচে বলতেন। সংবাদপত্রের একজন সফল সম্পাদক হবেন সাহসী, সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মী, পেশার প্রতি কমিটেড আর সত্য প্রকাশে আপসহীন। গোলাম সারওয়ার এমন একজন সম্পাদক হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার কারণেই সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। রাষ্ট্রও তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি ভূষিত হয়েছেন একুশে পদকে।
আজ মনে পড়ে, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আমরা প্রায় দু'সপ্তাহ সেই দেশের নির্বাচন-পূর্ব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছিলাম। গোলাম সারওয়ার সেখান থেকে সুন্দর সুন্দর প্রতিবেদন প্রতিদিন পাঠাতেন, যে প্রতিবেদনগুলো পাঠককে অজানা অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দিত। তিনি সুযোগ করে দিয়েছিলেন মার্কিন রাজনীতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির। আরও অনেক স্মৃতি, অনেক কথা- আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। প্রার্থনা করি, এই বাতিঘরের উজ্জ্বল আলোকরশ্মি বহুদিন আলোকিত করে রাখুক পেশাদার সাংবাদিকতার যাত্রাপথকে।
প্রবীণ সাংবাদিক
তার ৭৫তম জন্মদিন এবং জীবনের শেষ জন্মদিন উপলক্ষে একটা লেখায় বলেছিলাম, 'সব পেশাতেই কিছু লোক থাকে, যারা নিজ নিজ অবস্থানে প্রজ্বলিত আলোকবর্তিকা। প্রতিষ্ঠানতুল্য এসব ব্যক্তিত্ব পেশাকে সমৃদ্ধ করেন তাদের মেধা আর প্রতিভা দিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের থেকেও বড় হয়ে ওঠেন ব্যক্তি। সাংবাদিকতা পেশার তেমনই এক ব্যক্তিত্ব গোলাম সারওয়ার।' আজ সেই নিজের কথাগুলোই আরও বেশি করে হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তার ক্ষুরধার লেখনী আর সৃজনশীলতার মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধির যে শিখরে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই কথাটি আজ আরও বেশি করে বলতে ইচ্ছে করছে। কারণ সাংবাদিকতার আজকের চ্যালেঞ্জের সময়ে তার শূন্যতা বড় বেশি অনভূত হচ্ছে।
গোলাম সারওয়ারের সৃজনশীলতা আর মেধা তার সম্পাদিত প্রতিটি পত্রিকাতেই প্রস্ম্ফুটিত। ঐতিহ্যবাহী সাহসী সৃজনশীল সাংবাদিকতার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান ইত্তেফাকই তাকে নিয়ে এসেছিল পেশার শীর্ষস্থানে। যে প্রতিষ্ঠানকে গৌরবদীপ্ত করেছেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, সিরাজুদ্দীন হোসেন আর আসফউদ্দৌলা রেজা। বার্তা সম্পাদক হিসেবে গোলাম সারওয়ার সেই ইত্তেফাককে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। করেছিলেন পাঠকনন্দিত এক সাহসী সংবাদ প্রতিষ্ঠান। তার প্রাঞ্জল ভাষাশৈলীর প্রবন্ধ, গভীর রাজনৈতিক বিশ্নেষণ আর সৃজনশীল নজরকাড়া সংবাদ পরিবেশন তাকে সাংবাদিকতা পেশার এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল।
পরবর্তী সময়ে যখন তিনি সম্পাদক হিসেবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দুটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রতিষ্ঠা করেন, সেগুলোতেও তার সৃজনশীলতা ও অসাধারণ দক্ষতার চমক দেখা গিয়েছিল। অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে গোলাম সারওয়ার বাজারভর্তি অনেক পত্রিকার মধ্যে 'যুগান্তর' আর 'সমকাল'কে পাঠকনন্দিত করে তুলেছিলেন। বাজারে আসার মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই তিনি নবীন 'যুগান্তর'কে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সম্পাদক হিসেবে তার সফলতা সম্পর্কে যারা সন্দিহান ছিলেন, তাদের ভুল প্রমাণিত করে দৃঢ় মনোবল আর আত্মবিশ্বাসে যুগান্তরকে ইত্তেফাকের সমপর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
এরপর সমকাল প্রতিষ্ঠা ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জেও তিনি ছিলেন শতভাগ সফল। সৃজনশীলতা, পেশাদারিত্ব আর নান্দনিকতায় সমকাল সুধী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই। একই সঙ্গে অসংকোচ প্রকাশে সাহসী সাংবাদিকতায় সংবাদপত্র জগতে অনন্য স্থান দখল করে সমকাল। দুরন্ত সাহসিকতার লক্ষ্য সমকালের এ যাত্রা এখনও বিরতিহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন ব্যক্তি তার সৃষ্টিশীল মেধার সঙ্গে সাহসিকতা যোগ করে যে কত বড় অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন- গোলাম সারওয়ার তা করে দেখিয়েছেন।
তার আমৃত্যু ধ্যান-জ্ঞান ছিল সাংবাদিকতা। জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। পেশার সমৃদ্ধি, গতিশীলতার জন্যই তিনি প্রতি মুহূর্তে ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে। অসংখ্য দক্ষ সাংবাদিক তৈরি করেছেন, হাতে-কলমে তাদের শিখিয়েছেন। সাংবাদিকতায় অনেক মেধাবী মুখের সমাবেশ ঘটেছে তার হাত ধরেই। তিনি শিখিয়েছেন পেশার নীতিবোধ এবং সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়া; কারও কাছে মাথা নত না করা পেশাগত দর্শন। তিনি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সব সময় পেশাগত দৃঢ়তা বজায় রেখেছেন। সব সময় সত্যকে সত্য বলেছেন। কেউ তাকে দিয়ে কালোকে সাদা কিংবা সাদাকে কালো বলাতে পারেননি। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নেতাদেরও গোলাম সারওয়ার ছেড়ে কথা বলতেন না। তার কাছে যা সত্য আর যুক্তিযুক্ত মনে হতো, তিনি তা অসংকোচে বলতেন। সংবাদপত্রের একজন সফল সম্পাদক হবেন সাহসী, সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মী, পেশার প্রতি কমিটেড আর সত্য প্রকাশে আপসহীন। গোলাম সারওয়ার এমন একজন সম্পাদক হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার কারণেই সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। রাষ্ট্রও তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি ভূষিত হয়েছেন একুশে পদকে।
আজ মনে পড়ে, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আমরা প্রায় দু'সপ্তাহ সেই দেশের নির্বাচন-পূর্ব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছিলাম। গোলাম সারওয়ার সেখান থেকে সুন্দর সুন্দর প্রতিবেদন প্রতিদিন পাঠাতেন, যে প্রতিবেদনগুলো পাঠককে অজানা অনেক কিছু জানার সুযোগ করে দিত। তিনি সুযোগ করে দিয়েছিলেন মার্কিন রাজনীতি সম্পর্কে গভীর উপলব্ধির। আরও অনেক স্মৃতি, অনেক কথা- আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। প্রার্থনা করি, এই বাতিঘরের উজ্জ্বল আলোকরশ্মি বহুদিন আলোকিত করে রাখুক পেশাদার সাংবাদিকতার যাত্রাপথকে।
প্রবীণ সাংবাদিক
- বিষয় :
- স্মরণ
- গোলাম সারওয়ার
- রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ