প্রচ্ছদ
তারুণ্যের জিন্স
অরণ্য সৌরভ
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২২ | ২৩:২২
নিত্যনতুন প্যাটার্ন ও ডিজাইনের ধারায় ডেনিম বা জিন্স এখন বেশ স্টাইলিশ। জিন্সের ফেব্রিক, মেকিং, কালার, লেন্থেও ডিজাইনাররা পরিবর্তন এনেছেন। তরুণ-তরুণীদের পোশাক-আশাকে ডেনিম বা জিন্স অন্যতম উপাদান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। শীতের বাইরে অন্যান্য ঋতুতেও ডেনিম-জিন্সের কদর মেলে।
ফ্যাশনে ডেনিমের আবির্ভাব গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। তখন থেকেই ডেনিম 'টেনিউরড ট্রেন্ড' হিসেবে জায়গা দখল করে রয়েছে। জিন্স ও ডেনিমের পার্থক্যে গোলপাক বাঁধিয়ে ফেলেন অনেকেই। জিন্স হচ্ছে ডেনিম ফেব্রিক থেকে বানানো প্যান্ট। বিষয়টি অনেক 'সব জিন্সই ডেনিম, কিন্তু সব ডেনিম জিন্স নয়'- এর মতো। তাই কখনও জিন্সের শার্ট-প্যান্ট, জ্যাকেট হয় না। সবই ডেনিমের শার্ট-প্যান্ট, জ্যাকেট।
ডেনিমের ফেব্রিক দিয়ে যে পোশাক তৈরি করা হয় সেটিই জিন্স হিসেবে পরিচিত বলে জানান সারা লাইফস্টাইলের হেড অব ডিজাইন শামীম রহমান।
জিন্সের সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে প্রচলিত আছে, লেভি স্ট্রস নামের এক ভদ্রলোক ব্যবসা করার জন্য ১৯৫৩ সালে সানফ্রান্সিসকোতে যান। ১৮৭২ সালে তাঁর পরিচয় হয় দর্জি জ্যাকব ডেভিসের সঙ্গে। তিনি নিয়মিত লেভির কাছ থেকে কাপড় সংগ্রহ করতেন। লেভিকে একদিন জ্যাকব অফার করেন পার্টনারশিপ ব্যবসা শুরু করার জন্য এবং ভিন্ন কিছু প্রডাক্ট তৈরির জন্য। প্রথমেই মনোযোগী হন প্যান্টের দিকে। দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে মোটা কটনের কাপড় ব্যবহার করা হবে প্যান্টে। জার্মান ভাষায় এই কটন কাপড়কে বলা হয় জিনিয়া; যা বর্তমানে জিন্স হিসেবে পরিচিত। এ জিন্স প্যান্টের বাটন হুক এবং ব্যাক পকেট ডিজাইন লেভির করা। তাঁরা দু'জনে মিলে প্যাটেন্ট কিনে ছিলেন জিন্স প্যান্ট ব্যবসার। ১৮৭৩ সালের ২০ মে এই বিশেষ ধরনের জিন্স তৈরির প্যাটেন্ট পায় 'লেভি স্ট্রস অ্যান্ড কোং'। জিন্স বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তরুণ-তরুণীদের মাঝে জনপ্রিয় হতে থাকে। এটি একুশ শতকে এসে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
হালফ্যাশনে মেয়েদের জিন্সের ফ্যাশনে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। মেয়েদের আঁটসাঁট জিন্স তো আছেই, আছে ঢোলা জিন্স। বুটকাট লেগ, স্ট্রেইট কাট, ব্যাগি ছাড়াও নতুন করে এখন ফ্যাশনে যুক্ত হয়েছে হাই ওয়েস্ট, ডিস্ট্রেস (ছেঁড়া-ফাটা) ও ফেডেড (রং ঝলসানো) স্টাইল। প্যাটার্নের ক্ষেত্রে চলতি ধারাকে প্রাধান্য দিয়ে সারা লাইফস্টাইল এবারের ডেনিম/জিন্স পোশাক এনেছে। ফ্যাশন হাউস সারা বিভিন্ন ফ্যাশনউইক থেকে প্যাটার্ন বেছে নিয়ে ট্র্যাডিশনাল এবং ওয়েস্টার্ন সবদিক বিবেচনায় রেখে স্টাইলিশ ও নতুনধারায় পোশাক তৈরি করছে।
সারা লাইফস্টাইলের হেড অব ডিজাইন শামীম রহমান বলেন, 'আমাদের ডেনিম পোশাকগুলো তরুণদের ফ্যাশনেবল ও স্টাইলেবলের কথা চিন্তা করেই তৈরি করা। এ ধরনের পোশাকের ডিজাইন, প্যাটার্ন, অ্যামবাইশম্যান সবকিছুতেই ফিউশন টাইপ রাখার চেষ্টা করি। ফেব্রিক হিসেবে লাইট ওয়েটের ডেনিম, যেটিকে আমরা ত্যালতিল ডেনিম বলি, সেটি ব্যবহার করি।'
'হালকা শীতকে প্রাধান্য দিয়ে ডেনিম বা জিন্সের পোশাকগুলো তৈরি করে থাকি। ডেনিমের সঙ্গে আমাদের ট্র্যাডিশনকে কিছুটা মিশ্র করে নতুন ধরনের ফিউশনধর্মী আরামদায়ক তারুণ্যনির্ভর পোশাক তৈরি করি। এ ধরনের পোশাকগুলোতে প্রিন্ট, হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, মেশিন এমব্রয়ডারি, ছোট ছোট কারচুপি করি।' যোগ করেন শামীম রহমান।
সারা লাইফস্টাইলের এবারের আয়োজনে মেয়েদের জন্য কুর্তি, টপস, শার্ট, প্যান্ট, শাল, কামিজ এবং ছেলেদের জন্য শার্ট, প্যান্ট, জ্যাকেটসহ ডেনিমের বিভিন্ন ধরনের পোশাক রয়েছে।
বিশ্বরঙের ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বলেন, 'ডিজাইনের পাশাপাশি জিন্সের ওয়াশিংয়ে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ওয়াশড ডেনিম, এসিড ওয়াশড ডেনিম, ভিনটেজ ডেনিমসহ বিভিন্ন ধরনের ওয়াশড জিন্স তারুণ্যের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে।'
রঙের ক্ষেত্রে ইন্ডিগো ব্লু, লাইট ব্লুর পাশাপাশি গ্রে আর ফেডেড ব্লু বেশি দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের স্ট্রেট কাট, বুটকাট লেগ, লাইট ফ্লেয়ার প্যান্ট পরা যাবে টি-শার্ট, শার্ট, মিডিয়াম বা লং টপসের সঙ্গে। ডেনিমের ফেব্রিক দুই ধরনের। একটি ইন্ডিগো ডায়িং, অন্যটি সালফার ডায়িং। ট্র্যাডিশনাল ব্লু ও এর বিভিন্ন শেডের কাপড়গুলো হয় ইন্ডিগো ডায়িংয়ে। আর কালো, সবুজ, লাল ইত্যাদি কালার করা হয় সালফার ডায়িংয়ের মাধ্যমে।
ফ্যাশন হাউস লা রিভের ডিজাইনার বিপ্লব বিপ্রদাস বলেন, 'জিন্স প্যান্টে ছেঁড়া নকশা আগে দেখা গেলেও এখন ছেঁড়া নকশাতেই এসেছে নতুনত্ব। এখন হাঁটুর ওপর বেশ কিছুটা অংশ কাটা রেখে নকশা করা হচ্ছে। ছেঁড়া নকশাতে কাটা জায়গাটার ফাঁকা একটু বড় করে রেখে দেওয়া হচ্ছে কিংবা অন্য রঙের বাড়তি কাপড় লাগিয়ে করা হচ্ছে বিশেষ নকশা। মেয়েদের জিন্স পোশাকে পাতাসহ ফুলেল নকশা, শুধু ফুলেল নকশা, সিকোয়েন্সের কাজ, নানা রকম বিডস এবং বাটন ব্যবহার করা হচ্ছে।'
রঙ বাংলাদেশের কর্ণধার সৌমিক দাস জানান, 'শীতকালীন পোশাক হিসেবে আমাদের দেশে জিন্সের কদর দেখা যায়। কিন্তু এই ফেব্রিকটি সারা বছরের ফ্যাশন ট্রেন্ডের অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছে। জিন্স ছাড়া এসব স্টাইলিশ পোশাকে ব্যবহার করা হয় খুবই পাতলা ডেনিম।'
ক্যাজুয়াল আর ফরমাল দুই ধরনের লুকেই মিলবে জিন্সের পোশাক। জিন্সের প্যান্ট, ব্লেজার, ফরমাল শার্ট পরতে পারেন যে কোনো পার্টিতে। তরুণরা জিন্সের ক্যাজুয়াল শার্ট, জ্যাকেট পরে মাত করতে পারেন বন্ধুদের আড্ডা। প্যান্ট, জ্যাকেট ছাড়াও কটি, ফ্রক, টপস, টিউনিক, কুর্তি, জেগিংস তরুণীরা অনায়াসে ওয়েস্টার্ন কিংবা ফিউশন ক্যাজুয়াল পোশাক হিসেবে বেছে নিতে পারেন বলে জানান ডিজাইনার শামীম রহমান।
মডেল :সামিয়া অথৈ
মেকওভার :পারসোনা
পোশাক : সারা লাইফস্টাইল
ছবি :ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য
জিন্সের যত্ন
- দাগ পরিস্কার করুন। খেতে গিয়ে জিন্সে কিছু পড়লে বা সামান্য কাদা লাগলে সম্পূর্ণ জিন্সকে না ধুয়ে বরং দাগ পরিস্কার করুন। যে জায়গায় দাগ লেগেছে, সেখানে ভালো করে ঘষে পরিস্কার করে নিন।
- জিন্স ধোয়ার সময় অবশ্যই ঠান্ডা পানি ব্যবহার করুন। কারণ ঠান্ডা পানিতে জিন্স একমাত্র কাপড় বেশিদিন ভালো থাকে। তাড়াতাড়ি রং ফেড হয়ে যায় না বা কুঁচকে যায় না।
- জিন্স ঠিক (ভালো) রাখার জন্য যত কম কাচতে পারেন ততই ভালো হয়। কারণ বারবার ধুলে সুতা ঢিলে হয়ে যায়। তখন তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- অনেক ফ্যাশন বিশেষজ্ঞের মতে, জিন্স ভালো রাখার জন্য অন্তত ১০ বার পরার পর ধুয়ে নিন।
- কাচার পর জিন্স বাতাসে শুকানোর চেষ্টা করুন এবং খুব বেশি নিংড়াবেন না। শুকিয়ে যাওয়ার পর পরার আগে সঠিক তাপমাত্রা ঠিক করে আয়রন করে নিন।