বয়স বাড়ার পরও কেন নতুন করে অ্যালার্জি হয়
ছবি: সংগৃহীত
বিবিসি
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১৪
অনেকের ধারণা, অ্যালার্জি মানেই ছোটবেলা থেকে থাকা কোনো শারীরিক সমস্যা। কিন্তু অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ কেলি কোলাসের মতে, জীবনের যেকোনো সময় একজন মানুষের নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অনেক বছর পরও হঠাৎ কোনো খাবার, ধুলা, পরাগরেণু বা অন্য কোনো কিছুর প্রতি শরীর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, নতুন অ্যালার্জির পেছনে বংশগত কারণের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহ্যিক বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। অসুস্থতা, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, হরমোনের পরিবর্তন এমনকি নির্দিষ্ট ধরনের টিকের কামড়ও এর কারণ হতে পারে।
কেন হঠাৎ অ্যালার্জি হয়
ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ফুড অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা রিসার্চের পরিচালক রুচি গুপ্তা বলেন, সব অ্যালার্জি বংশগত কারণে হয় না। অনেক সময় বাইরের কোনো ঘটনা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে দেয়। সাধারণভাবে অ্যালার্জি তখনই তৈরি হয়, যখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষতিকর নয় এমন কোনো উপাদানকে বিপজ্জনক হিসেবে ধরে নেয়। এরপর সেটির বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ওই উপাদানের সংস্পর্শে এলে শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। এর ফলে নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, চোখ চুলকানো, ত্বকে ফুসকুড়ি বা শরীরের কোনো অংশ ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টসহ প্রাণঘাতী অ্যানাফাইল্যাক্সিসও হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঙ্গেও পরবর্তী সময়ে অ্যালার্জি তৈরির একটি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এর একটি কারণ হতে পারে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। মানুষের পরিপাকতন্ত্রে থাকা বিপুলসংখ্যক অণুজীবের সমষ্টিকে মাইক্রোবায়োম বলা হয়। এটি শরীরের বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করতেও সাহায্য করে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে এসব অণুজীবের ভারসাম্য বা বৈচিত্র্যে পরিবর্তন এলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজেও প্রভাব পড়তে পারে। তখন সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন কোনো উপাদানকেও শরীর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
গর্ভাবস্থায় অ্যালার্জি বাড়তে পারে
গর্ভাবস্থায় শরীরে বড় ধরনের হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। এর প্রভাব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরও পড়ে। কেলি কোলাস জানান, আগে থেকেই পরিবেশগত অ্যালার্জিতে আক্রান্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। আবার আগে কখনো অ্যালার্জি না থাকা নারীরও এ সময়ে হাঁচি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। একে ‘প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস’ বলা হয়। তবে এটি সবসময় প্রকৃত অ্যালার্জি নয়। সন্তান জন্মের পর সাধারণত এই সমস্যা চলে যায়। ঠিক কী কারণে এটি হয়, তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে হরমোনের ওঠানামার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
মেনোপজের পরও নতুন অ্যালার্জি
গবেষণায় দেখা গেছে, মেনোপজের পর নারীদের নতুন ধরনের অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। কোলাসের মতে, শরীরের হরমোনের পরিবর্তন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বয়স বাড়ার পরও নতুন করে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেওয়া অসম্ভব নয়।
টিকের কামড়ে মাংসে অ্যালার্জি
নতুন অ্যালার্জির অপ্রত্যাশিত কারণগুলোর একটি হলো লোন স্টার টিকের কামড়। উত্তর আমেরিকার স্থানীয় এই পরজীবী পোকার কামড়ে কারও কারও লাল মাংসের প্রতি অ্যালার্জি তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস প্ল্যাটস-মিলস ২০০৭ সালে এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। লন্ডনে ভেড়ার মাংসের চপ খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর রাতে ঘুম থেকে উঠে তাঁর সারা শরীরে আমবাতের মতো ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এর কয়েক মাস আগে হাইকিংয়ের সময় তাঁর শরীরে প্রচুর লার্ভা পর্যায়ের টিক লেগেছিল। পরে রক্ত পরীক্ষায় অ্যালার্জি-সংশ্লিষ্ট অ্যান্টিবডির উচ্চ মাত্রা পাওয়া যায়। তাঁর গবেষণাগার তখন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন মানুষের হঠাৎ লাল মাংসে অ্যালার্জি হওয়ার কারণ খুঁজছিল। এই অভিজ্ঞতা তাদের ‘আলফা-গ্যাল সিনড্রোম’ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। টিকের লালায় থাকা আলফা-গ্যাল নামের এক ধরনের শর্করা অণুর সংস্পর্শে এসে শরীর সেটিকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। পরবর্তী সময়ে গরু, ভেড়া বা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাংস খেলে অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর উপসর্গের মধ্যে রয়েছে ত্বকে চাকা বা ফুসকুড়ি, শরীরের কোনো অংশ ফুলে যাওয়া এবং পেটের সমস্যা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ৯০ হাজারের বেশি মানুষের শরীরে এই সিনড্রোম শনাক্ত হয়েছে।
নতুন অ্যালার্জি কি সেরে যায়
সব নতুন অ্যালার্জি স্থায়ী হবে এমন নয়। যেমন, গর্ভাবস্থায় হওয়া নাকের সমস্যাটি সাধারণত সন্তান জন্মের পর সেরে যায়। তবে অসুস্থতা, টিকের কামড় বা অন্য কোনো কারণে তৈরি হওয়া অ্যালার্জি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অ্যালার্জির পেছনে যদি অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে অন্ত্রের অণুজীবের পরিবর্তন বা কোনো অসুস্থতা-জনিত প্রদাহের ভূমিকা থাকে, তাহলে এসব কারণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অ্যালার্জির ঝুঁকি কমানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। রুচি গুপ্তা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সময় প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক, দই ও ফারমেন্টেড খাবারের মাধ্যমে অন্ত্রের অণুজীবের স্বাস্থ্য ও বৈচিত্র্য বজায় রাখার পরামর্শ দেন। তবে অ্যালার্জি প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় এসবের ভূমিকা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা
নতুন বা দীর্ঘদিনের অ্যালার্জিতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী কিছু ওষুধ নিয়ে গবেষণা চলছে। ‘জোলএয়ার’ নামের একটি ওষুধ কয়েক দশক ধরে হাঁপানির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্প্রতি খাদ্য অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেও এর কার্যকারিতা দেখা গেছে। এ ছাড়া রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অ্যালার্জেনের প্রতি কম সংবেদনশীল করে তোলার জন্য নতুন ধরনের টিকা এবং শরীরে সরাসরি অ্যালার্জেন-প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি দেওয়ার চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা চলছে।তবে রুচি গুপ্তার মতে, বর্তমানে নতুন করে তৈরি হওয়া অ্যালার্জিকে পুরোপুরি নির্মূল করার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। তারপরও অ্যালার্জি নিয়ে গবেষণায় গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিকিৎসার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন করে অ্যালার্জি দেখা দিলে কারণ নিজে থেকে ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে বারবার একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে কোন খাবার, ওষুধ বা পরিবেশগত কারণে সমস্যা হচ্ছে, তা শনাক্ত করা প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে অ্যালার্জি দেখা দিলেও সঠিক কারণ ও চিকিৎসা জানা থাকলে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।