হাদি হত্যা মামলার আসামি
দুবাইয়ে ফয়সালের অবৈধ বিনিয়োগ, মামলা করল পুলিশ
ফয়সাল করিম মাসুদ
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:১৭
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গড়া অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করছে পুলিশ। দেশটিতে ফয়সালের অননুমোদিত বিনিয়োগ রয়েছে, এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বলছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আদাবর থানায় ফয়সাল ও তাঁর স্ত্রীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের একজন উপপরিদর্শক বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় তাঁর অর্থ পাচারের বিষয়টি উঠে আসে।
মামলায় বলা হয়েছে, ফয়সালের বেশকিছু ব্যাংকিং হিসাব নম্বর পর্যালোচনা ও পরে এর সূত্র ধরে তদন্ত করে অবৈধ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাল্টিপল ট্যুরিস্ট ভিসাধারী। ২০২৩ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে আসেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাঁর অবৈধ বিনিয়োগ ও অর্থ পাচার করার আশঙ্কা রয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
সিআইডি বলছে, ফয়সাল করিম নিজের এবং স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার ব্যাংকিং হিসাবে যে অর্থ রেখেছেন তার উৎস গোপন করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর স্ত্রীর নামে ৬৫ লাখ টাকার এফডিআর করেন তিনি। ফয়সাল ও তাঁর স্ত্রীর এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৩টি ব্যাংকিং হিসাব এরই মধ্যে জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডি মামলায় বলেছে, ফয়সাল করিম প্রতারক। ঠিকাদারি ব্যবসার আড়ালে জাল দরপত্রের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। বাকিতে মালপত্র নিয়ে অনেকের টাকা দেননি। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একটি বেসরকারি ব্যাংকের রূপনগর শাখায় হিসাব নম্বর খোলেন। তিনি সেখানে নিজের ব্যবসার ধরন হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি, পরামর্শ দাতা ও ট্রেনিং ব্যবসার কথা উল্লেখ করেন। হিসাবটি খোলার পরের দুই মাসে তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। তবে হিসাব খোলার সময় তাঁর বার্ষিক টার্নওভার এক কোটি ২০ লাখ টাকার কথা উল্লেখ করেন। হিসাবটিতে স্বল্পসংখ্যক নগদ উত্তোলনের তথ্য থাকলেও বেশকিছু ক্লিয়ারিং ও স্থানান্তরের তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া যে নামে ব্যাংকিং হিসাব নম্বর খোলা হয়েছিল তার সঙ্গে লেনদেনের প্রকৃতি, ব্যবসার ধরন এবং ট্রেড লাইসেন্সের অসংগতি পাওয়া গেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ফয়সাল করিম মাসুদের মালিকানাধীন ‘অ্যাপল সফট আইটি’ ও রাব্বিল হোসেন নামে আরেকজনের প্রতিষ্ঠান ‘পিনাকল সলিউশন ইন্টান্যাশনালের’ সঙ্গে একটি চুক্তি হয়। রাব্বি হোসেনের প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনটি সরকারি কাজ যৌথভাবে করার প্রস্তাব দেয় ফয়সাল করিমের প্রতিষ্ঠান। পরে দেখা যায়, সরকারি তিনটি দরপত্রের প্রস্তাব জালিয়াতি করে তৈরি করা। তবে এরই মধ্যে এই কাজ যৌথভাবে করার কথা বলে ৫৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা ফয়সাল করিম তাঁর নিজের হিসাব নম্বরে নিয়ে গেছেন।
ওসমান হাদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিতি পান। জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ, আন্দোলনে শহিদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্রের দাবিতে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন। পরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি। ছয় দিন পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকে ফয়সাল করিম পলাতক। বর্তমানে ভারতে আটক আছেন বলে জানা যায়।
হাদি হত্যা মামলায় ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার তদন্তে তাঁর ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে বড় অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সিআইডি ফয়সাল ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্টদের হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। এর আগে ওসমান হাদি হত্যা মামলায় ফয়সাল ও তাঁর স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ওই আদেশ দেন।