ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘কলিং বেল বাজলেই মনে হয় মানুষটা ফিরেছে’

এক বছরে নিখোঁজ ১৮ মাঝিমাল্লা

‘কলিং বেল বাজলেই মনে  হয় মানুষটা ফিরেছে’
×

 নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বামী আলী আকবরের সঙ্গে সেলিনা আক্তারের সর্বশেষ কথা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টায়। তখন আকবরের ট্রলার কুতুবদিয়ার কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছিল। তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘ভোর হওয়ার আগেই আমরা অনেক দূরে চলে যাব, নেটওয়ার্ক পাবে না।’

এরপর মাস পেরিয়ে বছর গেছে, কিন্তু আজও নেটওয়ার্কে ফেরেননি আলী আকবর। ‘এফবি খাজা আজমীর’ ট্রলারের মালিক তিনি। চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে তাঁর সঙ্গে মাছ ধরতে সাগরে যাওয়া আরও ১৭ মাঝিমাল্লার সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজদের মধ্যে ছয়জন কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা। অন্যরা মহেশখালী, বাঁশখালী ও চট্টগ্রাম শহরের।

এ ঘটনায় গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সদরঘাট নৌ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন সেলিনা আক্তার। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর স্বামী আলী আকবর দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মালিকানাধীন ‘এফবি খাজা আজমীর’ ফিশিং বোটের মাঝি আবু তাহের, কর্মী জামাল, বাবুর্চি রুবেলসহ ১৪ জন সাগরে মাছ ধরতে যান। ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার পর থেকে আলী আকবরের ব্যবহৃত নম্বরসহ অন্য স্টাফদের মোবাইল ফোন বন্ধ।

সেলিনা বলেন, ‘এক বছর ধরে ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছি। রিংটোন বাজলে মনে হয় স্বামী ফোন করেছে। কলিং বেল বাজলে মনে হয়, এই বুঝি মানুষটা ফিরেছে। সে বেঁচে আছে, নাকি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, নাকি অপহৃত হয়েছে– কোনো কিছুই জানি না। এখন আমার অবস্থা হয়েছে এমন– শোক করার সুযোগও নেই, আবার স্বাভাবিক জীবনও যাপন করতে পারছি না।’
আলী আকবরের বড় ছেলে আবেদ ইসলাম বিবিএ তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। মেজো ছেলে আহাদুল ইসলাম ২০২৫ সালে জিপিএ ৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেছেন। তৃতীয় সন্তান সাদিয়াতুল মাওয়া দশম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে সামিয়া জান্নাত দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

এফবি খাজা আজমীরের মাঝি ছিলেন কক্সবাজারের নুনিয়াছড়ার আবু তাহের। তাঁর বড় মেয়ে নাসরীন জাহান মুন্নী বলেন, ‘আমার বাবা এফবি খাজা আজমীর ট্রলারে আগে আরও দুইবার মাছ মারতে গিয়েছিলেন। তৃতীয়বার দুর্ঘটনা ঘটল। শুনেছি ট্রলার মালিক আলী আকবরের সঙ্গে কক্সবাজারের কিছু মানুষের সমস্যা ছিল। এ কারণে কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা জানি না।’
তাহের মাঝিসহ নুনিয়াছড়া থেকে সাগরে মাছ মারতে গিয়েছিলেন ছয়জন। তাদেরই একজন ২ নম্বর ওয়ার্ডের মো. সিদ্দিকের ছেলে মোহাম্মদ হেলাল। তাঁর স্ত্রী রোকসানা বলেন, ‘আমার স্বামী প্রথমবার ট্রলারে মাছ মারতে গিয়েছিল। এক বছর ধরে তার কোনো খোঁজ নেই। 

আমার তিন বছর ও এক বছরের দুটি ছেলে আছে।’ পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলেন হেলাল। তাঁর অবর্তমানে মানবেতর দিন কাটছে রোকসানার।
হেলালের বাবা সিদ্দিক বলেন, ‘ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর আমরা সদরঘাট নৌ থানায় গিয়েছিলাম। পুলিশের হাতে-পায়ে ধরে বলেছিলাম অন্তত লাশটা হলেও যেন আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। এখন সাগর থেকে ফেরা বিভিন্ন ট্রলারের লোকজন আমাদের নানা কথা বলে। কেউ বলে, এফবি খাজা আজমীর ট্রলারের সব মাঝিমাল্লাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। কেউ বলে, তাদের অপহরণ করেছে আরকান আর্মি। 
কেউ বলে তারা সুন্দরবনের জলদস্যুদের হাতে আটক।’

মাতারবাড়ী ধলঘাট এলাকার সাহাবউদ্দিনও প্রথমবার এফবি খাজা আজমীর ট্রলারে করে সমুদ্রে মাছ মারতে গিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী 
কুলছুমা বেগম জানান, সাগরে যাওয়ার কয়েকদিন পর স্বামীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। এরপর এক বছর ধরে মোবাইল বন্ধ। কুলছুমা বলেন, ‘আমি এখনও শ্বশুরবাড়িতেই আছি। আমার ছোট ছোট ছয় সন্তান আছে। তারা প্রতিদিনই বাবার জন্য কাঁদে। বাচ্চাগুলোর মুখে খাবার তুলে দেওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।’  
সদরঘাট থানার এসআই মো. রুবেল বলেন, গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকে খাজা আজমীর ট্রলারের নিখোঁজ মাঝিমাল্লাদের মোবাইলের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করছি। দেশের প্রতিটি থানায় বার্তাও পাঠানো হয়েছে।’
অন্য একটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে হাতিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ ফয়সাল এফবি খাজা আজমীর ট্রলার সম্পর্কে খোঁজ করেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘ডাকাতি ঘটিত কারণে ট্রলারের মাঝিমাল্লারা নিখোঁজ বলে আমার ধারণা।’ 

আরও পড়ুন

×