ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ ক্ষতি নিরূপণে প্রয়োজন 'শিক্ষাশুমারি'

শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ ক্ষতি নিরূপণে প্রয়োজন 'শিক্ষাশুমারি'
×

রাশেদা কে চৌধুরী

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৫:০৪

এক মাস পর প্রথম পর্যায়ে গত ২২ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২ মার্চ থেকে খুলবে প্রাথমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যদিও সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে, তারপরও সার্বিক বিবেচনায় খোলাটা জরুরি ছিল। বলাবাহুল্য, করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এটা ছিল দ্বিতীয় ধাপের বন্ধ। আমরা দেখেছি, প্রথম ধাপে টানা দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় মাঝে মধ্যে খোলার পরিবেশ তৈরি হলেও নীতিনির্ধারকরা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। এবার সেখান থেকে কিছু শিক্ষণীয় বিষয়ের আলোকে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি সাধুবাদযোগ্য।

মাধ্যমিক পর্যায়ে ২২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর আমরা পরিস্থিতি অবলোকনের চেষ্টা করেছি। সরকারিভাবে এখনও জানানো হয়নি কত শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়েছে বা এ বিষয়ে গ্রামেগঞ্জে কিংবা মফস্বল শহরের কী পরিস্থিতি? তারপরও ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ করেছি। জেনেছি, মাধ্যমিক পর্যায়ে নেত্রকোনার একটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার ছিল ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে পঞ্চগড়ের একই ধরনের একটি প্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণির একটি মেয়ে বলেছে, ২২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিনে তাদের শ্রেণিতে ৭৫ জনের মধ্যে ২০ জন উপস্থিত ছিল। তারা বলছে, অনেকেরই হয়তো বিয়ে হয়ে গেছে অথবা করোনার টিকার শর্তের কারণেও হয়তো অনেকে অনুপস্থিত থাকতে পারে।

তবে সঠিক তথ্যের জন্য সরকারিভাবে বৈজ্ঞানিক জরিপ প্রয়োজন। বেসরকারিভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে একদিকে প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন হয়, অন্যদিকে শিক্ষকরা হয়তো 'ভালো' অবস্থা দেখানোর জন্য সঠিক তথ্য নাও দিতে পারেন। কিংবা শিক্ষক একরকম তথ্য দেবেন আবার শিক্ষার্থীর তথ্য অন্যরকম হবে। এ জন্য গত মাসে সমকালেই আমি এক সাক্ষাৎকারে বলেছি, ঝরেপড়াসহ শিক্ষায় সার্বিক ক্ষতি নিরূপণে একটি শিক্ষাশুমারি করার সময় এসেছে। সারাদেশে বাড়ি বাড়ি গিয়ে 'হাউসহোল্ড সার্ভে' বা খানা জরিপের মাধ্যমে এ জরিপ কাজ করা সম্ভব না হলে 'নমুনা জরিপ' বা স্যাম্পল সার্ভে করা যেতে পারে। সেখান থেকে তথ্য নিতে হবে, তাদের সন্তানরা শিক্ষায় ফিরছে কিনা, অথবা কারও বাল্যবিয়ে হয়েছে কিনা। বৈজ্ঞানিকভাবে খানা জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ না করা হলে তাদের সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে না। এ কাজ ব্যানবেইস বা বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো করতে পারে। এমনকি কোনো বেসরকারি এবং যোগ্যতাসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানও এটি করতে পারে। এর জন্য বিদেশি পরামর্শক প্রয়োজন নেই।

তবে ব্যানবেইস করলেই ভালো, যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের কাজ করে অভ্যস্ত এবং সবার কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বৈজ্ঞানিক সেই জরিপের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষার বিষয়টি কেবল সরকারের সঙ্গেই সংশ্নিষ্ট নয়। শিক্ষার্থী ঝরে পড়লে তাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে অভিভাবকের ভূমিকা যেমন রয়েছে, তেমনি স্থানীয় সমাজের ভূমিকাও কম নয়। বাল্যবিয়ের কারণে অনেকে ঝরে পড়ছে। সেখানেও সমাজ এগিয়ে আসতে পারে।


২০২০ সালের মার্চে যখন প্রথম করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, আমরা তখন ওই বছরের শেষ দিকে 'এডুকেশন ওয়াচে' গবেষণা দলের পক্ষ থেকে একটি জরিপ পরিচালনা করি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে ওই গবেষণায় চারটি ক্ষতির আশঙ্কা উঠে আসে। শিখন ঘাটতি বাড়তে পারে, বাল্যবিয়ে ও শিশুশ্রম বাড়তে পারে এবং অপুষ্টির হার বৃদ্ধি পেতে পারে। আমরা দেখেছি, করোনার কারণে অনেক পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, অনেকের আয় কমে যাচ্ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তা অপুষ্টি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেও নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তও সংকটে রয়েছে, সে কারণেও অপুষ্টি বাড়ার আশঙ্কা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিখনশূন্যতার বিষয়টিও শিক্ষার অনেক বড় ক্ষতি; যার ব্যাপকতা অনুধাবণ করা সহজ নয়। আমরা বুঝতে পারি ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, কিন্তু জানি না শিক্ষার্থীরা ঠিক কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানেও আমাদের হাতে বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। তবে আমরা জানি, আমাদের শিক্ষাক্রমে প্রতিটি শ্রেণির জন্য একটি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা আছে। যেমন পঞ্চম শ্রেণির পর শিক্ষার্থীদের কী কী শিখন দক্ষতা অর্জন করতে হবে ইত্যাদি। সেখানে যে ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এ শিখন ঘাটতি দূর করা এবং শিখন দক্ষতা অর্জনে প্রধান ভূমিকা রাখতে পারেন শিক্ষক। করোনার কারণে বহু শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিগত দুই বছরে বিশেষ করে মাধ্যমিকের বেসরকারি শিক্ষকদের অনেকে রুটি-রুজির জন্য কোচিংয়ে নেমেছেন। আমরা জানি, ২০১৯ সালে হাইকোর্ট কোচিং বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশনা দেয়। সেখানে বলা হয় সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক তার নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে না পেরে শিক্ষকরা অন্যদের পড়াচ্ছেন। অনেকেই শ্রেণিকক্ষের চেয়ে সেদিকেই ঝুঁকছেন।

আমরা জানি অনেক দেশে 'রিমিডিয়াল কোচিং' চালু আছে। শিখন ঘাটতি পূরণে সরকারও সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে। তখন শিক্ষকদের আর বাইরে যেতে হবে না। বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই শিক্ষার্থীদের জন্য এই কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে শিক্ষকরা যতটা না উপকৃত হবেন তার চেয়ে বেশি উপকৃত হবে শিক্ষার্থীরা। তবে এ জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা চাই। আমরা জানি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক 'স্টেকহোল্ডার' বা অংশীজন রয়েছেন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এ চারটির সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনও গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। এদের যূথবদ্ধ প্রয়াসেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দূর করা সম্ভব।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে করোনার টিকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সরকার ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় এনেছে, এটি নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। বন্ধের মধ্যেও টিকা কার্যক্রম চালু রেখে বাংলাদেশ একটি সাফল্যের মাইলফলক অর্জন করেছে।

প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২ মার্চ থেকে যখন খুলছে, তখন একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীন হলে চলবে না। আমরা জানি, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা এখনও টিকার আওতায় আসেনি। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বা উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধি ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সব শিক্ষার্থীর মাস্ক পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা, হাতধোয়া ও দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা চাই। করোনার সংক্রমণ কমেছে বটে কিন্তু এ মহামারি এখনও বিদায় নেয়নি বলেই বিষয়টি অবহেলা করা মোটেই ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতাও জরুরি। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে তাদের সচেতন করতে 'মা সমাবেশ' কিংবা প্রয়োজন অনুসারে মাইকিং করা যেতে পারে।

শিক্ষা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে শেষ করব। সপ্তাহ দুয়েক আগে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ঘোষণাকালে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, মহামারিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা খাত। আমাদের অর্থনীতি যেমন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, কৃষি খাত যেমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে তেমনি শিক্ষাকেও ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন যথাযথ গবেষণা। প্রধানমন্ত্রীর এ সময়োপযোগী দিকনির্দেশনার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। শিক্ষা প্রশাসনের তরফ থেকে অচিরেই বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হোক। সে আলোকে সীমিত পরিসর থেকে পুরোদমে কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যায়, কীভাবে ঝুঁকিগুলো নিরসন করা যায়, তাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

রাশেদা কে চৌধুরী: গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আরও পড়ুন

×